ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম,আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি,বৃহস্পতিবার ২১ মে ২০২৬ || জ্যৈষ্ঠ ৭ ১৪৩৩ || ৪ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি :
ট্রাম্পের কাছে পৃথিবীর মানচিত্রটা যেন এক বিশাল গ্লোবাল ক্যাসিনো, যেখানে ডনাল্ড ট্রাম্প হলেন এক দুর্ধর্ষ জুয়াড়ি যিনি গেমের নিয়ম মানার চেয়ে ক্যাসিনোর টেবিল উল্টে দিতে বেশি পছন্দ করেন। তার কাছে গোটা বিশ্বটাই একটা বিশাল ‘ব্যালেন্স শিট’; যেখানে ভালোবাসা বা আদর্শের কোনো জায়গা নেই, আছে শুধু লাভ আর ক্ষতির হিসাব।
Advertisement
অপরাধমূলক সংবাদ পাঠান
——————————-
আপনি অপরাধমূলক সংবাদ পাঠাতে পারেন লিখা ও ভিডিও এবং চিত্রসহ প্রধান সম্পাদক মোঃ ইসমাইল হোসেন দ্বায়ী থাকবেন। আপনার নাম ও ঠিকানা এবং মোবাইল নাম্বার গোপন থাকবে। লিখুন আমার ফেইজ বুকে Md Ismail Hossain অথবা ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম।মোবাইল: ০১৭১৪৪৯৭৮৮৫
——————————————
ট্রাম্পের কাছে কোনো দেশই তার চিরস্থায়ী বন্ধু নয়, বরং একেকটা ‘বিজনেস ডিল’। তার কূটনীতি অনেকটা ‘আনপ্রেডিক্টেবল ঝড়ের’ মতো। যাকে ভরসা করে ঘর থেকে বের হওয়া যায়, কিন্তু মাঝপথে ছাতা কেড়ে নিতে তার এক মুহূর্তও দ্বিধা হয় না। কেননা ট্রাম্প আসলে কাকে বন্ধু মনে করেন? আর কাকে শত্রু ভেবে বসে থাকেন তা বুজে উঠা বড়ই মুশকিল।
একদিকে তিনি চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করেন, অন্যদিকে আবার বেইজিং সফরে গিয়ে হাসিমুখে হাত মেলান শি জিনপিং এর সঙ্গে। আবার উত্তর কোরিয়াকে ধ্বংস করার হুমকি দেন, পরক্ষণেই সেই কিম জং উনের সাথে হাসিমুখে সেলফি তোলেন। একসময় ইউক্রেনকে সমর্থনের কথা বলেন, আবার পরে সহায়তা কমিয়ে দেন। একইসঙ্গে ইউক্রেনের বিরল খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রায় ৫০ শতাংশ মালিকানা চেয়ে বসে। আবার সৌদি আরবের সঙ্গে শত বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেন, আবার ন্যাটো মিত্রদের উদ্দেশে স্পষ্টভাবে বলেন ‘নিজেদের নিরাপত্তা নিজেরা সামলান।’
তাহলে প্রশ্ন উঠেই যায়, ট্রাম্প কার বন্ধু! আর ট্রাম্পের বন্ধু কে! চলুন জেনে নিই, ট্রাম্প কি আদর্শ দিয়ে রাজনীতি করেন, নাকি শুধুই স্বার্থ দিয়ে?
ট্রাম্পের রাজনীতির মূল সূত্র: পৃথিবী এক বিশাল ব্যবসার টেবিল ট্রাম্প যখন ওভাল অফিসে বসেন, তখন তিনি নিজেকে একজন ‘প্রেসিডেন্ট’ নয়, বরং একজন ঝানু ‘ডিল মেকার’ হিসেবে দেখেন। তার দৃষ্টিতে প্রতিটি দেশ হলো একেকটি ভেন্ডর বা সাপ্লায়ার, আর বিশ্ব রাজনীতি হলো একটি বিশালাকার করপোরেট ডিল। ট্রাম্পের পুরো বৈদেশিক নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটিই মন্ত্র: ‘আমেরিকার লাভ সবার আগে’।
তার দর্শনের মূল কথা হলো: ‘আমি তোমাকে রক্ষা করব ঠিকই, কিন্তু বিনিময়ে তুমি আমাকে কী দেবে?’ অর্থাৎ, ট্রাম্পের দরবারে বন্ধু বা শত্রু হওয়াটা কোনো আদর্শিক বিষয় নয়; বরং তা নির্ভর করে সেই মুহূর্তে আমেরিকার অর্থনীতি, অভ্যন্তরীণ নির্বাচন, ব্যবসা কিংবা কৌশলগত লাভ-ক্ষতির ওপর।
এ কারণেই তার রাজনীতিতে ‘স্থায়ী বন্ধু’ বলে কিছু নেই, আছে শুধু ‘স্থায়ী স্বার্থ’। যেমন, দক্ষিণ কোরিয়া বা জাপানের মতো পুরনো মিত্র দেশগুলো যখন আমেরিকার সামরিক সুরক্ষা চায়, ট্রাম্প তখন কূটনৈতিক শিষ্টাচারের বদলে সরাসরি খরচের বিল পাঠিয়ে দেন। তার সোজা হিসাব, টাকা না দিলে বা আমেরিকার পকেট ভারী না হলে তিনি ‘বন্ধুত্ব’ নামক ফাইলটি ডাস্টবিনে ফেলে দিতে এক মুহূর্তও দ্বিধা করবেন না। এই লেনদেনমুখী কূটনীতি-ই ট্রাম্পকে বিশ্বমঞ্চে একজন চরম অনিশ্চিত কিন্তু দুর্ধর্ষ জুয়াড়ি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক: ‘ইঁদুর-বিড়াল’ খেলা
চীনের সাথে তার সম্পর্কটা কোনো রৈখিক রেখা নয়, বরং একেবারে জিগজ্যাগ লাইনের মতো। তিনি চীনকে ‘কারেন্সি ম্যানিপুলেটর’ বা চোর বলে গালি দেন। অন্যদিকে দরকার হলে সেই চীনের সঙ্গেই আলোচনার টেবিলে বসেন। এই ধরুন ২০১৮ সালে, যখন ট্রাম্প চীনা পণ্যের ওপর শত শত বিলিয়ন ডলারের শুল্ক বসালো, তার অভিযোগ ছিল…
চীন আমেরিকার চাকরি নিয়ে যাচ্ছে
মার্কিন প্রযুক্তি ও মেধাস্বত্ব চুরি করছে
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অন্যায্য সুবিধা নিচ্ছে
এই পদক্ষেপ থেকেই শুরু হয় ভয়াবহ মার্কিন-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, যদি সম্পর্ক এত খারাপ হয়, তাহলে ট্রাম্প আবার চীনে যান কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর আসলে খুব বাস্তববাদী।
কারণ…………
আমেরিকার বড় বড় কোম্পানি এখনও চীনের বিশাল বাজারের ওপর নির্ভরশীল
বিশ্ব অর্থনীতি থেকে চীনকে পুরোপুরি বাদ দেয়া প্রায় অসম্ভব
আর ট্রাম্পের কৌশল হলো সরাসরি যুদ্ধ নয়, বরং চাপ সৃষ্টি করে দরকষাকষি করা
তাই তিনি একদিকে চীনের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ান, আবার অন্যদিকে আলোচনার পথও খোলা রাখেন। এমনকি যখনই শি জিনপিং কোনো বড় বাণিজ্যিক সমঝোতা বা চুক্তির ইঙ্গিত দেন, তখন ট্রাম্পের ভাষাও হঠাৎ নরম হয়ে যায়, আর তিনি শি জিনপিংকে “অসাধারণ বন্ধু” বলতেও দ্বিধা করেন না।
মূলত এটাই ট্রাম্পের বিখ্যাত “ডিল মেকার” স্টাইল: আগে চাপ সৃষ্টি করো, তারপর সেই চাপকে ব্যবহার করে নিজের জন্য ভালো চুক্তি আদায় করো।
পরিত্যক্ত মিত্র: যখন খেলা শেষ, সম্পর্কও শেষ
ট্রাম্পের ইতিহাসে সব থেকে বড় সমালোচনার জায়গা হলো বিপদের সময় মিত্রদের একা ফেলে আসা। একে বলা যায় ‘ইউজ অ্যান্ড থ্রো’ কূটনীতি। যেমন, সিরিয়ার কুর্দিরা আইএসের বিরুদ্ধে আমেরিকার হয়ে রক্ত দিল, কিন্তু যখনই ট্রাম্পের মনে হলো ওখানে সৈন্য রাখাটা ‘ব্যয়বহুল’, তিনি এক নিমিষেই সৈন্য সরিয়ে নিলেন। মিত্রদের ওপর হামলা হতে দেখেও তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
আফগানিস্তান: মিত্রের বদলে শত্রুর সাথে হাত মেলানো
ট্রাম্পের কাছে আফগানিস্তান ছিল আমেরিকার ইতিহাসের এক বিশাল ‘লোকসানি প্রজেক্ট’। ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল পরিষ্কার, ‘যে যুদ্ধে কোনো আর্থিক বা কৌশলগত লাভ নেই, সেখানে এক ডলার খরচ করাও বোকামি’। তাই দীর্ঘদিনের মিত্র আশরাফ গনি সরকারকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে বা অন্ধকারে রেখে তিনি সরাসরি প্রধান শত্রু তালেবানদের সাথেই আলোচনায় বসেন, যা ছিল আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বিরল। ট্রাম্প বুঝেছিলেন, এই যুদ্ধ শেষ করে সৈন্য ফিরিয়ে আনতে হলে যারা মাঠ পর্যায়ে শক্তিশালী তাদের সাথেই ডিল করতে হবে। এখানে নৈতিকতা বা বন্ধুত্বের চেয়ে তার কাছে ‘এক্সিট রুট’ বা বের হওয়ার পথটি বেশি জরুরি ছিল। তাই ট্রাম্প দোহা চুক্তির মাধ্যমে তিনি তালেবানদের সাথে একটি সমঝোতায় আসেন। এতে আফগান সরকারের ভবিষ্যৎ কী হবে বা ওই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কী দশা হবে, তা এক মুহূর্ত না ভেবে, যেকোনো মূল্যে খরচ কমাতে পুরনো মিত্রকে ত্যাগ করে সরাসরি প্রধান প্রতিপক্ষের সাথে হাত মিলিয়েছিলেন। একে বলা হয় ট্রাম্পের চরম প্যারাগমেটিক বা বাস্তববাদী রাজনীতি।
ন্যাটো জোট: ‘নিজেদের খরচ নিজে দাও’
ন্যাটো এবং ইউরোপীয় মিত্রদের প্রতি ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি কড়া ‘হিসাবরক্ষক’-এর মতো। তিনি মনে করেন, ইউরোপের দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আমেরিকার ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীল এবং তারা তাদের পর্যাপ্ত বাজেট প্রতিরক্ষা খাতে খরচ করছে না। তাই ট্রাম্পের স্পষ্ট কথা ছিল “আমেরিকা কেন সবার যুদ্ধের খরচ একাই বহন করবে?”
তার এই কথা শুনে ফ্রান্স এবং জার্মানির মতো দেশগুলো চরম উদ্বেগে পড়ে যায়। এমনকি ট্রাম্প ন্যাটো থেকে আমেরিকাকে বের করে নেয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন, যা কয়েক দশকের ট্রান্স-আটলান্টিক বন্ধুত্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। মূলত, ট্রাম্পের কাছে আন্তর্জাতিক জোটে থাকার চেয়ে আর্থিক সমবন্টন এবং বাণিজ্যিক ন্যায্যতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে ইউরোপীয় দেশগুলো প্রথমবারের মতো আমেরিকার ওপর পুরোপুরি ভরসা না করে নিজেদের আলাদা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কথা ভাবতে শুরু করে।
মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমি: ‘অস্ত্র বেচো, তেল সামলাও এবং ইরানকে ঠেকাও’
মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের নীতি চরম আদর্শহীন কিন্তু প্রবলভাবে স্বার্থকেন্দ্রিক ও ব্যবসায়িক। সৌদি আরবসহ এই অঞ্চলের ধনী দেশগুলোর সাথে তার ঘনিষ্ঠতার কোনো রাজনৈতিক দর্শন নেই, বরং তিনটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য আছে:
কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিশাল অস্ত্র চুক্তি
বিশ্ব তেলের বাজারের স্থিতিশীলতা এবং
ইরানকে একঘরে করার আঞ্চলিক কৌশল।
ট্রাম্পের দৃষ্টিতে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে তার বন্ধুত্ব কোনো নৈতিক ভিত্তির ওপর নয়, বরং “অস্ত্র বেচো, তেল সামলাও এবং ইরানকে ঠেকাও”।
গ্রিনল্যান্ড মিশন: ‘লোকেশন ভালো, কিনে ফেলি’
ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রস্তাবটি ছিল সবচেয়ে অদ্ভুত ঘটনা। একজন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীর মতো তিনি গ্রিনল্যান্ডকে মানচিত্রের ভূখণ্ড হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যতের কৌশলগত সম্পদ হিসেবে দেখেছিলেন। তার এই অদ্ভুত ইচ্ছার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ ছিল:
আর্কটিক অঞ্চলের সামরিক গুরুত্ব
খনিজ সম্পদ
চীন ও রাশিয়ার প্রভাব ঠেকানো
ডেনমার্ক যখন এই প্রস্তাবকে ‘উদ্ভট’ বলে প্রত্যাখ্যান করে, তখন ট্রাম্প অপমানিত বোধ করেন এবং তার নির্ধারিত ডেনমার্ক সফর বাতিল করে দেন। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, ট্রাম্পের কাছে ভূ-রাজনীতি মানেই বিশাল কোনো প্রপার্টি কেনাবেচার চুক্তি। যেখানে লাভের সম্ভাবনা আছে, সেখানে তিনি যেকোনো কূটনৈতিক শিষ্টাচার ভেঙে সরাসরি দরদাম করতে দ্বিধা করেন না।
কূটনীতির গিরগিটি রূপ: স্বার্থের টেবিলে বদলে যায় সম্পর্ক
ট্রাম্পকে বুঝতে গেলে একটা বিষয় পরিষ্কার রাখতে হবে, তিনি প্রচলিত কূটনীতিক নন। তিনি অনেকটা ব্যবসায়ীর মতো বিশ্ব রাজনীতি দেখেন।
তাই
আজকের প্রতিপক্ষ কালকের আলোচনার সঙ্গী হতে পারে
আবার আজকের বন্ধুও কাল চাপের মুখে পড়তে পারে
এই কারণেই ট্রাম্পকে নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি বলা হয়, “তিনি আবেগ দিয়ে বন্ধুত্ব করেন না,তিনি লাভ-লোকসান দেখে সম্পর্ক চালান।” ট্রাম্পের সমর্থকদের মতে,
তিনি আমেরিকার স্বার্থ আগে দেখেন
অকারণ যুদ্ধ চান না
ট্যাক্সপেয়ারের টাকা বাঁচাতে চান
পুরোনো কূটনৈতিক নিয়ম ভাঙেন
সমালোচকরা বলেন
তিনি মিত্রদের অনিশ্চয়তায় ফেলেন
হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেন
আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করেন
Advertisement
অন্যদিকে সমালোচকদের অভিযোগ, ট্রাম্পের হঠাৎ সিদ্ধান্ত ও চাপ তৈরির কৌশল অনেক সময় মিত্র দেশগুলোকেও অনিশ্চয়তায় ফেলে দেয়। তাদের মতে, তাঁর এই অপ্রচলিত কূটনীতি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত