ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম,বিশেষ প্রতিনিধি,শনিবার ২৫ এপ্রিল ২০২৬ || বৈশাখ ১২ ১৪৩৩ || ৭ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি :
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) উর্দু বিভাগের শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম ও ফলাফল জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভাইভা বোর্ডের সুপারিশ করা দ্বিতীয় স্থানে থাকা প্রার্থীকে বাদ দিয়ে তাঁর জায়গায় চতুর্থ স্থানের প্রার্থীকে নির্বাচিত করেছে কর্তৃপক্ষ। অনিয়ম বুঝতে পেরে ভাইভা বোর্ডের বিশেষজ্ঞ সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক মেধাতালিকার চূড়ান্ত ফলাফলে স্বাক্ষর করেননি। এমন জালিয়াতির পরও বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেটে শিক্ষক নিয়োগটি অনুমোদন পেয়েছে। এ নিয়োগ কার্যক্রম গত বছর সম্পন্ন হলেও জানাজানি হয় সম্প্রতি।
Advertisement
অপরাধমূলক সংবাদ পাঠান
——————————-
আপনি অপরাধমূলক সংবাদ পাঠাতে পারেন লিখা ও ভিডিও এবং চিত্রসহ প্রধান সম্পাদক মোঃ ইসমাইল হোসেন দ্বায়ী থাকবেন। আপনার নাম ও ঠিকানা এবং মোবাইল নাম্বার গোপন থাকবে। লিখুন আমার ফেইজ বুকে Md Ismail Hossain অথবা ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম।মোবাইল: ০১৭১৪৪৯৭৮৮৫
——————————————
বাদ পড়া নিয়োগপ্রত্যাশী প্রার্থীর নাম এ সালাম। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগ থেকে ২০০৮ সালে স্নাতক ও ২০০৯ সালে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১৪ সালে এমফিল এবং ২০১৯ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ভালো ফলের স্বীকৃতিস্বরূপ দুটি স্বর্ণপদক পান। একটি গবেষণাগ্রন্থসহ বেশ কিছু গবেষণা আর্টিকেলও রয়েছে তাঁর। নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি গতকাল শুক্রবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লিগ্যাল সেলে ই-মেইলযোগে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
নিয়োগ বোর্ডের সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয় ও লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগে তিনজন প্রভাষকের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। পরে সেই বিজ্ঞপ্তিতে নিয়োগ সম্পন্ন হয়নি। এরপর নতুন করে আবার গত বছরের ৩০ এপ্রিল তিনটি স্থায়ী প্রভাষক পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। গত বছরের ৭ আগস্ট তিনজন প্রভাষক নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ওই পরীক্ষায় মোট ৪৩ প্রার্থী অংশ নেন। নিয়ম অনুযায়ী, পদসংখ্যার তিন গুণ প্রার্থীকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়। এ হিসাবে ৯ প্রার্থী মৌখিক পরীক্ষায় ডাক পাওয়ার কথা।
তবে আগে একবার তিনজন প্রভাষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হওয়ায় উর্দু বিভাগের প্ল্যানিং কমিটির চিঠি ও রেজিস্ট্রার দপ্তরের নির্দেশনায় নিয়োগ বোর্ড তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, মোট ছয়জনকে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। এ হিসাবে ফলাফলের ভিত্তিতে মৌখিক পরীক্ষার জন্য মনোনীত করা হয় ১৮ নিয়োগপ্রত্যাশীকে। মৌখিক পরীক্ষার পারফরম্যান্স এবং একাডেমিক ক্যারিয়ার বিবেচনায় ছয় প্রার্থীর নাম ক্রম অনুযায়ী সাজানো হয় এবং নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়।
সূত্রগুলো আরও জানায়, এই নিয়োগ বোর্ডের বিশেষজ্ঞ সদস্য ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের অধ্যাপক মো. ইস্রাফিল। নিয়োগটি সিন্ডিকেট সভায় উত্থাপনের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তর থেকে মুঠোফোনে কল করে তাঁকে আবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ডেকে পাঠানো হয়। এরপর তাঁকে জানানো হয়, ছয়জন নয়, তিনজনকে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে।
এ সময় নিয়োগ বোর্ডের বিশেষজ্ঞ সদস্য তিনজনের চূড়ান্ত মেধাতালিকায় স্বাক্ষর করতে গিয়ে দেখেন, নির্বাচিত ও সুপারিশকৃত একজন প্রার্থীর ক্রম পরিবর্তন করা হয়েছে। দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী প্রার্থীর জায়গায় চতুর্থ স্থানে থাকা প্রার্থীর নাম ঢোকানো হয়েছে। তখন তিনি অনিয়মের অভিযোগ তোলেন এবং প্রতিবাদ জানান। চূড়ান্ত মেধাতালিকায় স্বাক্ষর না করে শুধু হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে চলে আসেন। তবে এসব আপত্তি উপেক্ষা করেই গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর সিন্ডিকেটে নিয়োগটি অনুমোদন পায়।
বোর্ডের বিশেষজ্ঞ সদস্য অধ্যাপক মো. ইস্রাফিল হোয়াটসঅ্যাপ কলে প্রথম আলোকে জানান, প্রথমে তিনজন প্রভাষক নিয়োগ হওয়ার কথা ছিল। পরে নিয়োগ বোর্ডের বাকি সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নেন, ছয়জনকে নিয়োগ দেওয়া হবে। সামগ্রিক দিক বিবেচনায় নিয়োগ বোর্ডের সদস্যদের সর্বসম্মতিক্রমে ছয় প্রার্থীর নাম ক্রমানুসারে সাজানো হয়। তখন কেউ দ্বিমত বা আপত্তি জানাননি। ছয়টি পদের বিপরীতে মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী মোট ১৮ জনের মধ্যে তাঁদের নির্বাচিত করা হয়। এরপর জানানো হলো, ছয়জনকে নেওয়া যাচ্ছে না, তিনজনকেই নিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই বিশেষজ্ঞ শিক্ষক আরও বলেন, ‘তিনজনকেই নেওয়া হলো। কিন্তু যিনি সেকেন্ড পজিশনে ছিলেন, তাঁকে স্কিপ করে চতুর্থ পজিশনে যিনি ছিলেন, তাঁকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলো। তখন আমি এটার প্রতিবাদ করে ভিসি স্যারকে বলেছিলাম, স্যার, আপনি নিজেই তো প্রার্থীদের নাম লিখেছিলেন। কার নাম প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়…রাখা হবে, সবার সম্মতিতে আমরা নির্ধারণ করেছিলাম। এখানে বিবেচনা ছিল ভাইভার পারফরম্যান্স ও একাডেমিক ক্যারিয়ার। কেউ কোনো দ্বিমত জানাননি। এখন কিসের বিবেচনায় তাঁকে আমরা স্কিপ করছি। সেটি আমার প্রশ্নের জায়গা ছিল। আমি বলেছিলাম, স্যার, এটা বোধ হয় উচিত হচ্ছে না। তখন তাঁরা বলার চেষ্টা করেছেন, যেহেতু তিনি (চতুর্থ স্থানে থাকা প্রার্থী) এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তাঁকে প্রায়োরিটি দেওয়া আরকি। তখন মাননীয় ভাইস চ্যান্সেলর একটা কথা বলেছিলেন, “মানবিক দিক বিবেচনা করলে এটা শোভনীয় হয় না, কিন্তু সামগ্রিক কথা চিন্তা করে আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।”’
দ্বিতীয় স্থানে থেকেও বাদ পড়া এ সালাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিয়োগ বোর্ডে নির্বাচিত হয়েও পরে কোনো কারণ ছাড়াই বাদ দেওয়া, এটা অবশ্যই বড় ধরনের জালিয়াতি। আমার সঙ্গে বেইনসাফি করা হয়েছে। এ ছাড়া বিশেষজ্ঞ শিক্ষকের স্বাক্ষর ছাড়াই সিন্ডিকেটে নিয়োগটি পাস করার পেছনে বড় ধরনের কোনো অনিয়ম থাকতে পারে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়। এটি জনগণের টাকায় চলে। তাহলে কেন নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে? যদি একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, সেটি বিজ্ঞপ্তিতে জানানোর দরকার ছিল।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, বিগত নকীব (সাবেক উপাচার্য সালেহ্ হাসান নকীব) প্রশাসন তাদের জামায়াত-শিবিরসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে নানা আয়োজন করেছে। উর্দু বিভাগের শিক্ষক নিয়োগেও অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
এ অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে কল করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য সাবেক উপাচার্য এবং সে সময়ের নিয়োগ বোর্ডের সভাপতি সালেহ্ হাসান নকীবকে। উর্দু বিভাগে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম হয়েছে, এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তিনি কোনো অনিয়ম হয়নি দাবি করে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথাই বলতে চাননি। পরে কথায়–কথায় সাবেক উপাচার্য বলেন, ‘যেখানে অনিয়ম হয়নি, সেখানে ব্যাখ্যা করার কিছু নেই। অভিযোগ তো যে কেউ করতে পারে, সংগত কারণে যাদের হয়নি তাদের তো অভিযোগের শেষ নেই। কাজেই ব্যাখ্যা করার কিছু নেই। এগুলো নিয়ে যদি কোনো কনসার্ন বডি থাকে বা কারও মাথাব্যথা থাকে, খোঁজখবর করে দেখুক।’
নিয়োগ বোর্ডের বিশেষজ্ঞ শিক্ষক চূড়ান্ত মেধাতালিকায় স্বাক্ষর না করার কারণ জানতে চাইলে সালেহ্ হাসান বলেন, ‘মনে করতে পারছি, একটা জায়গায় বোধ হয় তিনি স্বাক্ষর করেননি। বোর্ডে মোট পাঁচজন সদস্য ছিলেন। সবাই একমত হবেন, এমন কোনো কথা নেই আরকি। সো, অনিয়মের কোনো প্রশ্নই নেই।’
দ্বিতীয় স্থানে থাকা প্রার্থীকে কেন বাদ দেওয়া হয়েছে, এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হয় নিয়োগ বোর্ডের সদস্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিনের কাছে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভাইভা বোর্ডে যখন সিরিয়াল করা হয়, তখন শুধু যে মেধার ভিত্তিতে করা হয়, বিষয়টা এমন নয়। এখানে অনেক সময় জ্যেষ্ঠতা ও পিএইচডি ডিগ্রি আছে কি না, সেটা বিবেচ্য বিষয় হিসেবে সিরিয়াল করা হয়। এ ছাড়া যাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তাঁর বয়স ফিফটি প্লাস ছিল। সব দিক বিবেচনায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে এখানে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।’
যদিও বাদ পড়া প্রার্থী এ সালামের বয়স ছিল ৩৯ বছর। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগে এর চেয়ে বয়স্ক প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়ার নজির রয়েছে।
Advertisement

এ অনিয়মের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক মো. ফরিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘অভিযোগটি আমার নজরে আসেনি। বিশেষজ্ঞ সদস্যের অমত থাকতে পারে, কিন্তু স্বাক্ষর না করলে সমস্যা। যদি অভিযোগ পাই, তাহলে অবশ্যই খতিয়ে দেখতে হবে।’



