(ভিডিও)অচিন পাখির দেশে ফরিদা পারভীন, রেখে গেলেন অমলিন সুর

SHARE

য়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম,বিশেষ  প্রতিনিধি,  রোববার,১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,২৮ ভাদ্র ১৪৩৩০১ রবিউস সানি ১৪৪৮:

‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’, ‘বাড়ির কাছে আরশিনগর’, ‘মিলন হবে কত দিনে’ লালন সাঁইয়ের এই গানগুলো উচ্চারিত  হলেই যে কণ্ঠটি অসংখ্য শ্রোতার মনে ভেসে ওঠে, তিনি ফরিদা পারভীন। তার কণ্ঠে লালনের গান শুধু গান হয়ে থাকেনি; হয়ে উঠেছে দর্শন, আত্মজিজ্ঞাসা আর মানুষের ভেতরের অচেনা জগতকে খুঁজে দেখার এক অনন্য পথ।

  • Advertisement

  • আপনি অপরাধমূলক সংবাদ পাঠাতে পারেন লিখা ও ভিডিও এবং চিত্রসহ প্রধান সম্পাদক মোঃ ইসমাইল হোসেন দ্বায়ী থাকবেন। আপনার নাম ও ঠিকানা এবং মোবাইল নাম্বার গোপন থাকবে। লিখুন আমার ফেইজ বুকে Md Ismail Hossain অথবা ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম।মোবাইল: ০১৭১৪৪৯৭৮৮৫,০১৮০৬৬৭৬৬৬৩

২০২৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলাদেশের লোকসংগীতের এই কিংবদন্তি শিল্পী। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। আজ তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাই ফিরে তাকালে মনে হয় ফরিদা পারভীন চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর গান যেন আরও গভীরভাবে থেকে গেছে মানুষের স্মৃতিতে।

যেভাবে লালনের গানে ফরিদার আগমন

ফরিদা পারভীনের শিল্পীজীবনের মোড় ঘুরে যায় লালনগীতির হাত ধরে। কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় দোল পূর্ণিমার এক অনুষ্ঠানে গুরু মোকছেদ আলীর অনুরোধে তিনি প্রথম লালনের গান গাওয়ার সুযোগ পান। গানটি ছিল ‘সত্য বল সুপথে চল’। শুরুতে খুব একটা আগ্রহী না হলেও গানটি গাওয়ার পর তার ভেতরে তৈরি হয় এক গভীর অনুরণন। পরবর্তী সময়ে ফরিদা পারভীন নিজেই বলেছিলেন, সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে অস্থির করে তুলেছিল; তার মনে হয়েছিল, এই গান তাঁকে আরও শিখতে হবে, আরও গাইতে হবে। সেই শুরু। এরপর লালন হয়ে ওঠেন তাঁর শিল্পীজীবনের অন্যতম প্রধান আশ্রয়।

ফরিদা পারভীন। ছবি: সংগৃহীত

ফরিদা পারভীন। ছবি: সংগৃহীত

ফরিদা পারভীনের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব সম্ভবত এখানেই তিনি লালনের গানকে শুধু পরিবেশন করেননি, নিজের কণ্ঠ ও গায়কীর মাধ্যমে সেগুলোকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’, ‘বাড়ির কাছে আরশিনগর’, ‘মিলন হবে কত দিনে’, ‘আমি অপার হয়ে বসে আছি’ এসব গান তাঁর কণ্ঠে নতুন মাত্রা পেয়েছে।

তার গায়কীতে ছিল শাস্ত্রীয় সংগীতের অনুশীলন, লোকগানের মাটির গন্ধ এবং লালনের দর্শনের প্রতি গভীর নিষ্ঠা। ফলে তার গান শুনলে শুধু সুর শোনা যায় না; মনে হয়, গানের ভেতর দিয়ে শিল্পী যেন শ্রোতাকে নিজের ভেতরের মানুষটির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন। বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে তার অবদানকে তাই কেবল একজন গায়িকার সাফল্য দিয়ে মাপা যায় না। তিনি লালনের গানকে দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চেও নিয়ে গেছেন।

‘লালন সম্রাজ্ঞী’ উপাধি

শ্রোতারা তাকে ভালোবেসে ‘লালন কন্যা’ কিংবা ‘লালন সম্রাজ্ঞী’ নামে ডাকতেন। তবে ফরিদা পারভীন নিজে এসব উপাধির চেয়ে গানকেই বড় করে দেখতেন। তার কাছে লালনের গান ছিল আত্মার সঙ্গে কথোপকথন। সেই কারণেই তার পরিবেশনায় লালনের দর্শন কখনো কেবল মঞ্চের পরিবেশনা মনে হয়নি। তার কণ্ঠে ‘অচিন পাখি’ যেন সত্যিই মানুষের শরীরের খাঁচায় বন্দি অদৃশ্য সত্তার গল্প হয়ে উঠত; ‘আরশিনগর’ হয়ে উঠত নিজের ভেতরের মানুষটিকে খোঁজার প্রতীক।

দীর্ঘ সংগীতজীবনে ফরিদা পারভীন পেয়েছেন অসংখ্য সম্মাননা। বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্মান একুশে পদক তিনি অর্জন করেন ১৯৮৭ সালে। চলচ্চিত্রেও তার অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য; ১৯৯৩ সালে ‘অন্ধ প্রেম’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পীর সম্মান পান। আন্তর্জাতিক পরিসরেও তিনি বাংলাদেশের লোকসংগীতকে পরিচিত করেছেন।  তবে তার সবচেয়ে বড় পুরস্কার হয়তো মানুষের ভালোবাসা। কয়েক প্রজন্মের শ্রোতা তার গান শুনে বড় হয়েছেন। তাঁর গাওয়া গান এখনো নতুন শ্রোতার কাছে পৌঁছে যায়, নতুন করে আবিষ্কৃত হয় লালনের দর্শন।

  • Advertisement

এক বছর কেটে গেছে। ফরিদা পারভীন নেই কিন্তু তার গান আছে। ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ কিংবা ‘বাড়ির কাছে আরশিনগর’ শুনলে, মনে হয় তিনি যেন এখনও গাইছেন। শিল্পীর মৃত্যুর পরও তাদের কাজের মধ্যে থেকে যান। তাদের গান থেকে যায় প্রজন্মের পর প্রজন্মে। ফরিদা পারভীনও চলে গেছেন অচিন দেশের পথে কিন্তু তার গানের মাঝে রয়েগেছেন।

ফরিদা পারভীন। ছবি: সংগৃহীত