পানি জমেছে বাম বুকে, অস্ত্রোপচার ডান পিঠে!

SHARE

dan-bamঢাকা: বাম বুকে পানি জমায় শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিলো শামছুল হক শাকিবের (১৮)।

গত শনিবার (৬ আগস্ট) সকালে শাকিবকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় মহাখালীর বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে নিয়ে আসেন তার ছোট ভাই রাকিব। সেখানে টিকেট কেটে চিকিৎসকের পরামর্শ নেন।

হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. সেরাজুল ইসলাম রোগীর অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ দেখে দ্রুত অস্ত্রোপচার করে বুক থেকে পানি অপসারণের পরামর্শ দেন। এই হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করাতে এক সপ্তাহ বিলম্ব হবে এবং খরচ হবে আড়াই হাজার টাকা।

তবে সাড়ে ৪ হাজার টাকা দিলে এক দিনেই অস্ত্রোপচার শেষে রোগী বাড়ি ফিরতে পারবেন। বিকেলে কল করতে বলেন সেরাজুল।

কল করলে বিকেলে বক্ষব্যাধি হাসপাতালের সামনে রিলায়েন্স ক্লিনিকে অস্ত্রোপচার হবে- জানান তিনি।

সাড়ে ৪ হাজার টাকা জমা দেওয়ার পর ক্লিনিকের ছোট একটি রুমে নিয়ে তার ডান পিঠে ইনজেকশন পুস করা হয়। কিন্তু পানির বদলে বেরিয়ে আসে রক্ত! ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠেন শাকিব।

রেজাউল বুঝতে পারেন তার অবহেলায় বাম বুকের বদলে ডান পিঠ দিয়ে ইনজেকশন পুস করা হয়েছে। দ্রুত কিছু ব্যথানাশক ওষুধ দিয়ে দ্রুত রোগীকে ফের বক্ষব্যধির জরুরি বিভাগে নিয়ে যেতে বলেন তিনি।

অস্ত্রোপচারের জন্য নেওয়া সাড়ে ৪ হাজার টাকাও ফেরৎ দেন।

ওইদিন সন্ধ্যায় বক্ষব্যাধি হাসপাতালে বাম বুকে অপারেশন করা হয় শাকিবের। সেখানে পাইপ স্থাপন করে ধীরে ধীরে পানি বের করে আনা হচ্ছে। একদিনের বদলে এখন ১৩ দিনের চিকিৎসা নিতে হবে তাকে।

সোমবার (৮ আগস্ট) সকালে বক্ষব্যধি হাসপাতালের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে কথা হয় শাকিবের সঙ্গে। তার ভাই রাকিব এবং মা সামছুন নাহারও ছিলেন সেখানে।

তারা বলেন, শাকিবের বাম বুকে একটি পাইপ স্থাপন করা হয়েছে। ধীরে ধীরে পানি বের হয়ে আসছে। দিনে তিনবার পানির ব্যাগ খালি করতে হচ্ছে। তবে এখন শারীরিক অন্য কোনো সমস্যা নেই।

রাকিব বাংলানিউজকে বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ১ম সিমেস্টারের ছাত্র শাকিব। আজও (সোমবার) সিমেস্টার ফাইনাল পরীক্ষা ছিলো, কিন্তু অংশ নেওয়া হয়নি। ১১ আগস্ট অনুষ্ঠেয় পরীক্ষাতেও অনুপস্থিত থাকতে হবে।

শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকায় আসেন সামছুন নাহার। এখন নতুন করে বাড়তি খরচ যোগ হয়েছে পরিবারে। সামছুন নাহারের জন্যে ১০ দিন ঢাকায় থেকে সন্তানের চিকিৎসা করানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

সরজমিনে ৫৩, মহাখালী বাণিজ্যিক এলাকার বাংলাদেশ ইনসিওরেন্স একাডেমি ভবনে গেলে রিলায়েন্স মেডিকেল সার্ভিসের দেখা মেলে। ভবনের বাইরে টানানো ১০ জন চিকিৎসকের নাম ও পদবীর মধ্যে সেরাজুল ইসলামের নামও রয়েছে।

অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে ভবনের দুই তলায় উঠলে ডান পাশে ছোট দরজা দিয়ে ক্লিনিকের প্রবেশ পথ। বদ্ধ পরিবেশ, বোঝা যায় ক’টি রুম ভাড়া নিয়ে এই ক্লিনিক বানানো হয়েছে। টিনের দরজায় লেখা ‘এক্স-রে রুম’। ৮ বর্গফুটের মতো জায়গা নিয়ে একটি ফার্মেসি, সেখানে ক‍াউকে দেখা যায়নি। একজন অভ্যর্থনাকারী রয়েছেন- যিনি নিজেই অপেক্ষারত রোগীদের বিভিন্ন রিপোর্ট এনে দিচ্ছেন। এক্স-রে রুমের পাশেই রয়েছে রোগীদের আরো দুটি অপেক্ষা কক্ষ। সেখানেই রয়েছে রোগী দেখার বেড।

স্টাফদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ও ইনস্টিটউট এবং হাসপাতালের সাবেক পরিচালক, অধ্যাপক ডা. শেখ গোলাম মোস্তফার নাম দিয়েই চলছে এই ক্লিনিক। মূলত তিনি এখানে বেশি সময় দেন।

সূত্র জানায়, বক্ষব্যাধি ও ক্যান্সার হাসপাতালের অনেক রোগীদের সেখানকার চিকিৎসকরাই এই ক্লিনিকে পাঠিয়ে দেন। সেরাজুল ইসলাম সঠিকভাবে ওই অস্ত্রোপচারটি করতে পারলে পুরো সাড়ে ৪ হাজার টাকাই তিনি পেতেন। বিনিময়ে ক্লিনিকে এক্স-রে এবং অন্যান্য পরীক্ষা করাতে শাকিবকে পরামর্শ দিতেন তিনি। এছাড়াও এখান থেকেই ওষুধ কিনতে হতো।

রোগী এনে ভুল চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়ে কথা বলতে ডা. সেরাজুল ইসলামকে বেশ ক’বার ফোনে চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।