ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম,বগুড়া প্রতিনিধি,মঙ্গলবার ১৮ আগস্ট ২০২৬ || ভাদ্র ৩ ১৪৩৩ || ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি:
সকালের আলো ফুটতেই বগুড়ার বিআরটিসি ডিপো চত্বরে এক নতুন ইতিহাস গড়ার প্রস্তুতি। হালকা গোলাপি রঙে মোড়ানো বাসটির চালকের আসনে বসে আছেন খাদিজাতুল কোবরা। স্টিয়ারিং ধরে থাকা তার দু’হাতে স্পষ্ট আত্মবিশ্বাসের ছাপ। উদ্বোধন শেষে বাসটি ডিপো ছেড়ে এগোতে শুরু করে তিনমাথা রেলগেট এলাকার সরকারি আজিজুল হক কলেজের সামনে পর্যন্ত, সেখান থেকে ঘুরিয়ে আবার ডিপোতে এসে উদ্বোধনী কার্যক্রম শেষ হয়। বাসের ড্রাইভার নারী, কন্ডাক্টর নারী, সহকারীও নারী আর যাত্রী কেবলই নারী।
-
Advertisement

-
আপনি অপরাধমূলক সংবাদ পাঠাতে পারেন লিখা ও ভিডিও এবং চিত্রসহ প্রধান সম্পাদক মোঃ ইসমাইল হোসেন দ্বায়ী থাকবেন। আপনার নাম ও ঠিকানা এবং মোবাইল নাম্বার গোপন থাকবে। লিখুন আমার ফেইজ বুকে Md Ismail Hossain অথবা ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম।মোবাইল: ০১৭১৪৪৯৭৮৮৫,০১৮০৬৬৭৬৬৬৩
রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামের পাশাপাশি মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বগুড়াতেও বিআরটিসির বিশেষ ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ চালু হয়। দেশের গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা এবং নারীর ক্ষমতায়নের বার্তা নিয়ে সড়কে নামল এই সার্ভিস। বগুড়া শহরের জন্য ঘটনাটি একটু বেশিই বিশেষ। কারণ জেলা শহরের রাস্তায় নারীদের জন্য বিশেষ কোনো বাস সার্ভিস এবারই প্রথম।
আপাতত বগুড়ার দুটি রুটে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলবে এই গোলাপি বাস। একটি শেরপুর থেকে মাটিডালি, অন্যটি মোকামতলা থেকে বনানী। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নন-এসি এই বাস দুটির নতুন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি কিলোমিটারে ২.২৩ টাকা।

সকালে বিআরটিসির ট্রেনিং গ্রাউন্ড চত্বরে বগুড়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা ও আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিতিতে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যুক্ত হয় বগুড়া।

নারীর নিরাপদ যাত্রায় নতুন দিগন্ত ‘পিংক বাস’: প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ
এরপর বগুড়ার বাস দুটির যাত্রা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্থানীয় সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা বলেন, এটি কেবল ঢাকা, চট্টগ্রাম বা বগুড়ার বিষয় নয়; পর্যায়ক্রমে পুরো বাংলাদেশেই এই সেবা চালু হবে। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীদের কথা চিন্তা করে তাদের নিরাপদ যাতায়াত ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে প্রতিশ্রুতি প্রধানমন্ত্রী দিয়েছিলেন, এটি তারই বাস্তবায়ন। একটি দেশকে এগিয়ে নিতে হলে নারী-পুরুষ সবাইকে সমানভাবে কাজ করতে হবে। প্রতিদিন সকালে কর্মক্ষেত্র কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যে বের হয়ে গণপরিবহনে ওঠা মানেই নারীদের জন্য এক ধরনের যুদ্ধ। সেই ভোগান্তির দৃশ্যপট বদলাতেই নতুন এই উদ্যোগ।
বাসে ওঠার অনুভূতি জানাতে গিয়ে যাত্রী রুমানা বলেন, আমরা গণপরিবহনে যখন ছেলেদের সঙ্গে যাতায়াত করি, অনেক ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ এই বাস সার্ভিস চালুর ফলে আমরা কোনো রকম ভোগান্তি ছাড়াই নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারব।
আরেক শিক্ষার্থী তানি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তার প্রতিশ্রুতি রেখেছেন। মেয়েদের নিরাপত্তার জন্য এটা অনেক বড় অবদান রাখবে। শিক্ষার্থীরা খুব কম খরচে যাতায়াত করতে পারবে। তবে বগুড়ার বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য দুটি বাস হয়ত কম হয়ে যাবে, আশা করি সরকার আস্তে আস্তে বাস সংখ্যা আরও বাড়াবে।

এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বগুড়া জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক নাজমা আক্তার কবি কাজী নজরুলের পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করে বলেন, ‘কোনো কালে একা হয়নিকো জয়ী পুরুষের তরবারি, প্রেরণা দিয়েছে, শক্তি দিয়েছে বিজয় লক্ষ্মী নারী।’

চট্টগ্রামেও নারীদের জন্য চালু হলো ‘মহিলা বাস সার্ভিস’
তিনি বলেন, সকালে কর্মজীবী নারীদের কর্মস্থলে পৌঁছানোর জন্য যে যুদ্ধ করতে হতো, তা সত্যিই অনুধাবন করা হয়েছে। বগুড়ার অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীদের পক্ষ থেকে সরকারের এই মহতী উদ্যোগকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।
যানজটে ঠাসা কিংবা ব্যস্ত সড়কে বড় গাড়ি চালানো সহজ কথা নয়। তবে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পুরোপুরি প্রস্তুত বগুড়ার নারী চালক ও বিআরটিসি কর্তৃপক্ষ।
গাড়ি চালিয়ে আসা নারী বাসচালক খাদিজাতুল কোবরা গর্ব প্রকাশ করে বলেন, একটি বাসে মোট তিনজন নারী থাকবে- ড্রাইভার, কন্ডাক্টর ও হেলপার। মহিলা বাস সার্ভিসের চালক হতে পেরে সত্যিই গর্বিত অনুভব করছি। অন্য নারীরাও যদি এই পেশায় আসতে চায়, তাদের আসা উচিত।
আরেক চালক তাসলিমা পারভীন সাথী বলেন, মূলত নারীদের নিরাপত্তার জন্যই এই ব্যবস্থা। কারণ সাধারণ বাসে নারীদের যে হয়রানির শিকার হতে হয়, তা আমরাও অনুভব করেছি। এখানে নারী চালক ও স্টাফ থাকায় কোনো অসুবিধা হবে না।
বাসগুলোর পরিচালনা পদ্ধতি ও স্থায়িত্ব নিয়ে বিআরটিসি বগুড়া বাস ডিপোর ম্যানেজার শাহিনুল ইসলাম বলেন, আপাতত মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে শেরপুর-মাটিডালি এবং মোকামতলা-বনানী রুটে দুটি বাস দিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করেছি। চালক, কন্ডাক্টর ও হেলপার সবাই আমাদের স্থায়ী নারী কর্মী। পর্যায়ক্রমে চাহিদার সাপেক্ষে মন্ত্রণালয় থেকে আরও বাস সরবরাহ করা হলে অন্যান্য রুটেও চালু করা হবে।
-
Advertisement

প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতার বিষয়ে বিআরটিসির মহিলা প্রশিক্ষক সুবর্ণা খাতুন জানান, বিআরএসপি প্রজেক্টের মাধ্যমে সার্কুলার দিয়ে প্রায় ৫০০ জনের মধ্য থেকে বাছাই করে দক্ষ প্রশিক্ষক ও চালক তৈরি করা হয়েছে। বগুড়াতেও বাস সংখ্যা বাড়ানো হলে সার্ভিস দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত ও দক্ষ নারী চালক আমাদের প্রস্তুত আছে। সড়কে নামা এই গোলাপি বাস কেবল দুটি গাড়ি চলাচলের গল্প নয়, এটি বগুড়ার নারীদের নিরাপদ পথচলা, আত্মনির্ভরশীলতা এবং সমঅধিকারের এক নতুন দিগন্ত।



