ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম,আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি,শুক্রবার ০৮ মে ২০২৬ || বৈশাখ ২৫ ১৪৩৩ || ২০ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি :
গ্রেটার ইসরাইল, নেতানিয়াহুর সেই ভয়ংকর পরিকল্পনা। যেখানে থাকবে না কোনো ফিলিস্তিন, দখল হবে সিরিয়া, জর্ডান, লেবানন, মিশরের কিছু কিছু অঞ্চল। কায়েম হবে জায়নবাদী শাসন। ঠিক সেই পথে এগিয়ে ইরান যুদ্ধের সুযোগে স্বাধীন দেশ লেবাননে নিজের থাবা বসিয়ে দিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী।
Advertisement
অপরাধমূলক সংবাদ পাঠান
——————————-
আপনি অপরাধমূলক সংবাদ পাঠাতে পারেন লিখা ও ভিডিও এবং চিত্রসহ প্রধান সম্পাদক মোঃ ইসমাইল হোসেন দ্বায়ী থাকবেন। আপনার নাম ও ঠিকানা এবং মোবাইল নাম্বার গোপন থাকবে। লিখুন আমার ফেইজ বুকে Md Ismail Hossain অথবা ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম।মোবাইল: ০১৭১৪৪৯৭৮৮৫
——————————————
ইসরাইলি সেনাবাহিনী দক্ষিণ লেবাননের প্রায় ১ হাজার ৫০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করে নিয়েছে, যা লেবাননের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ১০ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ। গাজার মতো নির্বিচারে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হচ্ছে। সেখানকার বাসিন্দারা হয় নিহত হয়েছেন নয়তো পালিয়ে গেছেন। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, ঠিক গাজার কায়দায় দক্ষিণ লেবাননের ভূখন্ড ইসরাইল দখল করতে পারে। যেখানে গড়ে উঠবে ইসরাইলিদের বসতি। মধ্যপ্রাচ্যের বুকে হবে কথিত ৩০০০ বছর আগের ইহুদিদের প্রমিস ল্যান্ড।
গ্রেটার ইসরাইল ধারণা ও বিতর্ক
ইসরাইলের উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে বৈশ্বিক সন্দেহের কেন্দ্রে রয়েছে ‘গ্রেটার ইসরাইল’ ধারণা। ঐতিহাসিক ও ধর্মীয়ভাবে এটি বাইবেলের প্রতিশ্রুত ভূমিকে বোঝায়, যার সীমানার মধ্যে দক্ষিণ লেবাননও পড়ে। জেনেসিস ১৫:১৮-এ উল্লেখিত “মিশরের নদী থেকে ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত” বিস্তৃত ভূখণ্ডের ব্যাখ্যা অনুযায়ী লেবানন পুরোপুরি এই আদর্শ মানচিত্রের অন্তর্ভুক্ত।
নিরাপত্তা নাকি দখল
মার্চ থেকে দক্ষিণ লেবাননে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরাইলি বাহিনী। অথচ প্রথমে বলা হয়েছিল, এই অভিযান শুধু নিরাপত্তার জন্য। অর্থাৎ সীমান্তে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য। কিন্তু এখন পরিস্থিতি দেখে বিশ্লেষকরা বলছেন, বিষয়টি শুধু অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে থামছে না। এই “নিরাপত্তা বাফার জোন” নামের আড়ালে দক্ষিণ লেবাননে দীর্ঘমেয়াদি দখলের একটা পরিকল্পনা থাকতে পারে।
ঠিক এখানেই উঠে আসছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অনেকের মতে, এর পেছনে শুধু সামরিক কৌশল নয়, বরং নেতানিয়াহুর মাথায় পুরোনো একটি আদর্শিক চিন্তাও কাজ করছে, যা এখন আবার ইসরাইলের রাজনীতিতে খুবই গুরুত্ব পাচ্ছে। তাই এখন প্রশ্নটা শুধু এই নয় যে যুদ্ধ কবে শেষ হবে, বরং এটি কি সেই দীর্ঘদিনের আলোচিত ‘গ্রেটার ইসরাইল’ ধারণার প্রকল্পের সূচনা কিনা! এটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কারা
গাজার মতোই এখানেও সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে লেবাননের সাধারণ মুসলিমদের। দক্ষিণ লেবাননের বহু এলাকা ধ্বংস হয়ে গেছে। হাজার হাজার মানুষ আহত ও নিহত হয়েছে। শত শত মানুষের মৃত্যুর খবর এসেছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, প্রায় ১০ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। অনেক গ্রাম এখন একেবারে জনশূন্য।
সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা ঘটে ১০ এপ্রিল, যেদিন একদিনেই ৩০০-এর বেশি মানুষ নিহত হন বলে দাবি করা হয়।
২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত লেবাননে আড়াই হাজার ছাড়িয়েছে। এছাড়া ৭ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ লেবানন কার্যত বড় ধরনের মানবিক সংকটের মধ্যে পড়েছে।
২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত লেবাননে আড়াই হাজার ছাড়িয়েছে। এছাড়া ৭ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ লেবানন কার্যত বড় ধরনের মানবিক সংকটের মধ্যে পড়েছে।
অতীত আর বর্তমান
ইতিহাস বলছে, বহু আগে থেকে লেবাননে আগ্রাসন চালিয়ে আসছে। কিন্তু সেসবের সাথে বর্তমানের ঘটনার মৌলিক তফাৎ আছে। ২০২৬ সালের এই আগ্রাসনকে ১৯৮২ সালের “অপারেশন পিস ফর গ্যালিলি”-এর সঙ্গে তুলনা করলে ইসরাইলের কৌশলগত রাজনীতি বিবর্তনের একটি স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়।
১৯৮২ সালে এরিয়েল শ্যারন-এর নেতৃত্বে ইসরাইলি আগ্রাসনের মূল লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক; তেল আবিব চেষ্টা করেছিল বশির জেমায়েল-এর নেতৃত্বাধীন ম্যারোনাইট খ্রিস্টান গোষ্ঠীর সঙ্গে জোট গড়ে বৈরুতে একটি ইসরাইলপন্থি সরকার প্রতিষ্ঠা করতে। তখনকার লক্ষ্য ছিল লেবাননকে একটি আনুষ্ঠানিক শান্তি অংশীদার বানানো, যদিও জেমায়েলের হত্যাকাণ্ডের পর সেই কৌশল ভেঙে পড়ে । এর ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং শেষ পর্যন্ত ইসরাইল লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর ধরে সামরিক উপস্থিতি ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে বাধ্য হয়।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের যুদ্ধ আর “রাজনৈতিক প্রকৌশল”-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি পুরোপুরি “ভৌগোলিক ও ভৌত আধিপত্য”-এ রূপ নিয়েছে। ইসরাইল এখন লেবানন পরিচালনার জন্য স্থানীয় মিত্র খুঁজছে না; বরং দক্ষিণ লেবাননে তথাকথিত “গাজা মডেল” প্রয়োগ করছে। এই মডেলের মধ্যে রয়েছে গ্রাম ও অবকাঠামোর পদ্ধতিগত ধ্বংস, যাতে মূল জনগোষ্ঠী আর সেখানে বসবাস করতে না পারে। এটি ১৯৮০-এর দশকের তুলনায় আরও কঠোর একটি নিয়ন্ত্রণ কৌশল, যার মূল লক্ষ্য এ এলাকাকে স্থায়ীভাবে খালি করা।
কৌশলগত পরিবর্তন ও সামরিক শক্তি
এই পদ্ধতির পার্থক্য কৌশলগত স্থানগুলো-যেমন: হারমোন পর্বত ও নাবাতিয়েহ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণেও স্পষ্ট। আগে যেখানে ভূখণ্ড দখল ছিল অস্থায়ী দরকষাকষির হাতিয়ার, এখন প্রতিটি দখলকৃত জমিতে স্থায়ী সেনা অবকাঠামো নির্মাণ এবং বেসামরিক জমির নথি ধ্বংস করা হচ্ছে। ১৯৮২ সালের ব্যর্থতা থেকে ইসরাইল যেন শিখেছে, যে লেবাননের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়; তাই এখন লক্ষ্য তার ভূগোলকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা।
২০২৬ সালে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের পরিমাণও অনেক বড়। রিজার্ভ বাহিনীসহ প্রায় ৬ লাখ ৪৩ হাজার সেনা একাধিক ফ্রন্টে নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করছে। আকাশে একচেটিয়া আধিপত্য ইসরাইলকে শত্রুপক্ষের যোগাযোগ ও সরবরাহ কেন্দ্রগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ধ্বংস করার সুযোগ দিচ্ছে। এই কৌশল একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত করে: দুর্বল প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তি চুক্তির মাধ্যমে নয়, বরং অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণে ফাঁকা অঞ্চল তৈরি করেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
এর আগেই ঘোষণা ইসরাইলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ স্পষ্টভাবে বলেছেন, ইসরাইলের নতুন আন্তর্জাতিক সীমানা দক্ষিণ লেবাননের লিতানি নদী পর্যন্ত হওয়া উচিত। এটি কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বক্তব্য নয়; বরং মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত একটি নির্দেশনা। তার মতে, এই সীমান্ত পরিবর্তন একটি “নতুন বাস্তবতা”, যা সংঘাতের পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মেনে নিতে হবে।
ইসরাইল সামরিকভাবে নিয়ন্ত্রিত লেবাননের এলাকায় ইহুদি বসতি স্থাপনের প্রচারণা চালাচ্ছে। গ্রেটার ইসরাইলের সমর্থকদের কাছে লিতানি নদী শুধু সামরিক প্রতিরক্ষা লাইন নয়; এটি একটি ধর্মীয় সীমানা।
আঞ্চলিক পরিবর্তন ও লেবাননের সংকট
২০২৪ সালের শেষ দিকে সিরিয়ায় আসাদ শাসনের পতন একটি ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি করে, যা ইসরাইল কাজে লাগিয়েছে। সিরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকার, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের মধ্যে “জয়েন্ট ফিউশন মেকানিজম”-এর মাধ্যমে নতুন নিরাপত্তা সমন্বয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যার ফলে উত্তরের ফ্রন্টে তেল আবিব এখন অনেক বেশি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে। এটিই তথাকথিত “প্যাক্স ইসরাইলিকা” একটি আঞ্চলিক ব্যবস্থা, যেখানে নিরাপত্তা সম্পূর্ণভাবে ইসরাইলি সামরিক শক্তি দ্বারা নির্ধারিত।
বর্তমানে লেবানন প্রায় রাষ্ট্র ব্যর্থতার দ্বারপ্রান্তে। ১০ লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষের চাপ এবং ২০২৮ সাল পর্যন্ত সংসদীয় নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় বৈরুতের কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতি ইসরাইলের জন্য দক্ষিণে কার্যত সংযুক্তিকরণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করছে।
কূটনৈতিক অচলাবস্থা ও ভবিষ্যৎ
স্থায়ী যুদ্ধবিরতির কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখন অচলাবস্থায়, কারণ ইসরাইল এমন শর্ত দিচ্ছে যা লেবাননের সার্বভৌমত্বের মূলকে আঘাত করে। যেমন বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরের নিয়ন্ত্রণ। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প-এর প্রশাসনের সম্ভাব্য সমর্থনের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক চাপ না থাকলে দক্ষিণ লেবাননের দখল মধ্যপ্রাচ্যের নতুন মানচিত্রে স্থায়ী রূপ নিতে পারে। লেবাননকে হয় এই নতুন ব্যবস্থায় একটি নিরাপত্তা-নির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে প্রবেশ করতে হবে, না হয় আরও অভ্যন্তরীণ ভাঙনের ঝুঁকি নিতে হবে।
Advertisement

সব মিলিয়ে লিতানি নদী এখন শুধু একটি ভৌগোলিক নাম নয়; এটি লেবাননের সার্বভৌমত্বের পতন এবং গ্রেটার ইসরাইল ধারণার উত্থানের প্রতীক। বিশ্বের নীরবতার মধ্যে লেভান্ট অঞ্চলের সীমানা আগুন ও কংক্রিট দিয়ে পুনরায় আঁকা হচ্ছে। যুদ্ধ শেষ হলেও এর প্রভাব বহু বছর ধরে থাকবে। মানুষ, রাষ্ট্র এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার ওপর। কেননা, যুদ্ধের ধোঁয়া একসময় কেটে যায়, কিন্তু তার আঁচে বদলে যাওয়া মানচিত্র, প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করে তার দাগ।

বুধবার (৬ মে) লেবাননের দক্ষিণে ইসরাইলি হামলার পর ধোঁয়ার কুণ্ডলী। ছবি: সংগৃহীত


