(ভিডিও) সেনাবাহিনীর মনোবল ভাঙলে লাভ কার?

SHARE

য়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ  ২৪.ম,কুমিল্লা প্রতিনিধি, বুধবার   ২৯ এপ্রিল ২০২৬ ||  বৈশাখ ১৬ ১৪৩৩ || ১১ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি :

অবস্থাটা একদম আজব। বাংলাদেশের মতো অবস্থাটা দুর্যোগ-দুর্বিপাকসহ জাতীয় নানা প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর ওপর ভরসা করার দৃষ্টান্ত বিশ্বে কম দেশেই আছে। আবার সেনাবাহিনী নিয়ে অবান্তর কথা, আজেবাজে ন্যারেটিভ তৈরির প্রবণতাও বিশ্বে বিরল। বাংলাদেশে হিম্মত-সাহস-স্মার্টনেস দেখাতে গিয়ে সেনাবাহিনী নিয়ে হালকা কথা চালাচালির বাতিক রয়েছে। আরোপিত দোষারোপ, উড়িয়ে দেওয়া, গুঁড়িয়ে দেওয়া, ইট খুলে ফেলা, বিলুপ্ত করে দেওয়ার মতো কিছু একটা বলে কিছু দিন ঝিম মেরে থাকার মহলটি চিহ্নিত। চব্বিশের জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের পর এ রোগটি সেরে যেতে পারত। কিন্তু, মাঝেমধ্যেই রোগ চাগাড় দেওয়ার লক্ষণ ভর করছে। সেই সঙ্গে আচানক-আজগুবি, রাতের ঘুম নষ্ট করা গুজবের হাট।

‘গত রাতে সেনানিবাসে ছোটখাটো ক্যু একটা হয়ে গেছে, সামনে বড় রকমের একটা হবে, সেনাপ্রধানকে ঘেরাও করে ফেলা হয়েছে, জাহাঙ্গীরগেটসহ বিভিন্ন জায়গা দিয়ে ট্যাংক বেরিয়ে পড়েছে’-এ ধরনের তথ্য রটাতেও বিবেকে বাধছে না গুজববাজদের। আলোচিত গুম কমিশনকে বানিয়ে ফেলা হচ্ছে সেনাবাহিনীর বিচারের কমিশন। একটা সূক্ষ্ম ন্যারেটিভ তৈরি করে বলা হচ্ছে, শেখ হাসিনার শাসনামলে কুকর্মে জড়িত সেনাসদস্যদের বিচার। সেনা সদর থেকে বিষয়টি পরিষ্কার করা হয়েছে আনুষ্ঠানিক ব্রিফিংয়ে। লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ারে জানানো হয়েছে, গুমে জড়িত অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তিনটি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারিকৃত ২৫ কর্মকর্তার মধ্যে ১৫ জন এখনো সেনাবাহিনীতে কর্মরত। একজন অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে। এই ১৬ জনের মধ্যে মাত্র একজন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক সামরিক সচিব মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ আত্মগোপনে। তার বিষয়েও বিচারিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে সেনাবাহিনী থেকে। তাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ‘ইলিগ্যাল অ্যাবসেন্ট’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। খুঁজে বের করার চেষ্টাও চালাচ্ছে। তারা অভিযুক্ত। অভিযোগ প্রমাণের বাকি। তার পরও সেনাবাহিনী বিচারে বাগড়া দেয়নি। সাফ কথায় জানানো হয়েছে, ‘নো কম্প্রোমাইজ উইথ ইনসাফ’। ট্রাইব্যুনাল আইন ও সেনা আইনকে মুখোমুখিও করেনি, বরং আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে সহায়তা দিচ্ছে। গুম-সংক্রান্ত অভিযোগ তদন্তের জন্য গঠিত জাতীয় কমিশনকে সেনাবাহিনী শুরু থেকেই সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে আসছে। কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী তথ্যসংগ্রহে সহযোগিতা করেছে। নথি সরবরাহও করেছে। সাক্ষাৎকার নেওয়ার ব্যবস্থাও করেছে। বিচার প্রক্রিয়া শুরুর পর অভিযুক্তদের পরিবার থেকে আলাদা করে সেনা হেফাজতে এনে সেনাবাহিনী এ বিচারে সহায়তা করছে। গুমের শিকার পরিবারগুলোকে গভীর সমবেদনাও প্রকাশ করেছে। অথচ বিচার বা রায়ের আগেই মিডিয়া ট্রায়াল, পাবলিক ট্রায়াল সব করে ফেলা হচ্ছে। ব্যক্তির অপরাধে গোটা বাহিনীকেই কাঠগড়ায় নিয়ে আসার ন্যারেটিভচর্চা হচ্ছে নিদারুণভাবে। ডিজিএফআইসহ গোয়েন্দা সংস্থাকে হয় বিলুপ্ত, নইলে অকর্মণ্য ঘোষণার ছবকও দেওয়া হচ্ছে। এ ছবক দেওয়া ব্যক্তিরাও ভালো করে জানেন, প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল না। এটি কতিপয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়। আরো জানেন, ঘটনাকালে অভিযুক্তদের কেউই সেনাবাহিনীর সরাসরি কমান্ডের অধীনে কর্মরত ছিলেন না। ডিজিএফআই বা র‍্যাবে ছিলেন ডেপুটেশন বা প্রেষণে। এ বাহিনীগুলো সেনাবাহিনীর অধীনে নয়। বিশেষ করে ডিজিএফআই সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর অধীনে। সেনাবাহিনীর কমান্ড কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত নয়। অভিযুক্তদের কর্মকাণ্ড সেনাবাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক কমান্ডের বাইরে। তাদের সম্পর্কে সেনা সদরের পক্ষে অবগত হওয়া বা নজরদারি করার ব্যবস্থাই নেই। আর র‍্যাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে।

এ অবস্থায়ও গোটা সেনাবাহিনীকে মুখোমুখি করে দেওয়ার দুষ্টু প্রবণতা। ডিজিএফআইকে পারলে বিলুপ্ত করে দেওয়া। এ প্রবণতায় কবে কে কখন দেশের বিচার বিভাগই বিলুপ্ত করে দেওয়ার বায়না ধরে বসে কে জানে! বলা যাবে, প্রধান বিচারপতিসহ বিচারকদের কয়েক জনও পালিয়েছেন, বিগত সরকারের নানা ভেজাল কাজ করেছেন। তাই বিচার বিভাগই আর রাখার দরকার নেই। স্বয়ং খতিব পালিয়েছেন, তা হলে বায়তুল মোকাররমই বিলুপ্ত করে দেওয়া হোক। এভাবে বায়না ধরতে ধরতে, মনগড়া কথা বলতে বলতে একসময় যদি কেউ ন্যারেটিভ দিয়ে বসে-দেশে ভেজালের পর ভেজাল হচ্ছে, তাই ভেজালের এ দেশটাই আর রাখার দরকার নেই। বিলুপ্ত করে দেওয়া হোক বাংলাদেশকেই?

বিশ্বের কোথাও এমন বায়নানামার নজির নেই। তিউনিসিয়া, শ্রীলঙ্কা, নেপালসহ কয়েকটি দেশেও বাংলাদেশ ধাঁচে অভ্যুত্থান হয়েছে। সেখানে এখানকার মতো এমন বাতিল-রহিত, বিলোপ-বিলুপ্ত বায়না ধরার কাণ্ডকীর্তি নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ, এফবিআই, ভারতের

‘র’ বা পাকিস্তানের আইএসআই নিয়েও কথা হয় মাঝেমধ্যে। কিন্তু বিলোপ-বিলুপ্ত-সীমিত করার কথা শোনা যায়নি কখনো। সেনাবাহিনীর মনোবল নষ্ট করা, তাদেরকে বিব্রত বা উত্তেজিত করতে খোঁচানো মোটেই কাম্য নয়। এতে লাভকার হচ্ছে এবং হবে? সুস্থ, বিবেচক, দেশপ্রেমিক মাত্রই তা উপলব্ধিযোগ্য।

Advertisement

তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন এসেছে, এসব কি সঠিক বিচারের জন্য? নাকি অন্য কোনো বা কারো উদ্দেশ্যে? এর পরও সেনাবাহিনী সম্পর্কে বিভিন্ন অপপ্রচার বা গুজব ছড়ানো প্রকারান্তরে দেশবিরোধী কাজ। বিশেষ করে নির্বাচনকে সামনে রেখে। বাংলাদেশের জন্য সময় এখন খুবই স্পর্শকাতর। বিভিন্নভাবে দেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা স্পষ্ট। তারা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে সেনাবাহিনীকে কখনো সরকারের, কখনো সাধারণ মানুষের মুখোমুখি দাঁড় করাতে চাইবে-এটা স্বাভাবিক। কেওয়াজ বাঁধানোই তাদের মূল উদ্দেশ্য। দেশের অধিকাংশ মানুষের আকাঙ্ক্ষা একটি সুন্দর নির্বাচন, নির্বাচিত সরকার, সর্বোপরি স্থিতিশীল দেশ। তা তাদের ভীষণ অসহ্য। এর বিশেষ অংশ হিসেবেই সেনাবাহিনীর মনোবল নষ্ট করা। বাহিনীর সদস্যদের চটানো, ক্ষিপ্ত করা। ছক মতো মাঝেমধ্যেই সেই জালটি ফেলে তারা। গুমের বিচারে সেনাবাহিনীর কয়েক সদস্যকে হেফাজতে নেয়ার ছুতায় নেমেছে নতুন আয়োজনে ও উদ্যমে। প্রোপাগান্ডাবাজদের উদ্দেশ্য লার্জ স্কেলে। একদিকে ভেজাল বাধিয়ে প্রতিশোধ পাগলামি, অন্যদিকে, চব্বিশের পটপরিবর্তনে সেনাবাহিনীর জনসম্পৃক্ততার অনন্য দৃষ্টান্তকে বানচাল করা। কেউ দেশে, কেউ ভিন দেশে বসে এ অপকর্মে যুক্ত। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে এ চক্র বেশি তেজোদ্দীপ্ত। প্রায় প্রতিদিনই সেনাবাহিনী সম্পর্কে ছাড়া হচ্ছে কোনো না কোনো গুজব-বটিকা। কখনো সরকারের সঙ্গে সেনাবাহিনীর, প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সেনাপ্রধানের বা সেনাপ্রধানের সঙ্গে তার অধস্তনদের কল্পিত বিরোধের কিচ্ছা ছড়ানো হচ্ছে মুখরোচক করে। এবারের নির্বাচন একটি মহা ইমানি পরীক্ষা নির্বাচন কমিশনের জন্য। নির্বাচনের মুখ্য দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের হলেও তা কেবল তাদের একার নয়। এখানে প্রার্থী, ভোটার, রাজনৈতিক দল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীসহ অংশীজন অনেক। ইসি অনেকটা রেফারির মতো। আর আম্পায়ারিংয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী বলতে মানুষ আগে চেনে পুলিশকে। তারপর সেনা, র‍্যাব, বিজিবি, আনসার। বাস্তবতা হচ্ছে, পুলিশ এখনো ট্রমাগ্রস্ত। গেল সরকার আমলে নানা ক্রিয়াকর্মে পুলিশ হয়ে যায় জনতার প্রতিপক্ষ। ঐ জায়গা থেকে পুলিশ এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এর বিপরীতে সেনাবাহিনী চলে এসেছে আরো ভরসা ও আস্থার জায়গায়। গেল সরকার নির্বাচনকালীন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞা থেকেই তাদের খারিজ করে দিয়েছিল। এবার আসন্ন জাতীয় নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে নির্বাচন কমিশন ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২’ সংশোধন করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীকে আবারও অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা আর প্রয়োগকারীর মধ্যে বেশ ফারাক আছে। ভোট দেওয়া ভুলে যাওয়া মানুষের বিশ্বাস, নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনী আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালনে সুফল আসবে। এই বিশ্বাস থেকেই ২০০১ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আরপিও সংশোধন করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় প্রতিরক্ষা কর্ম বিভাগগুলো বা সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। কেবল জাতীয় সংসদ নির্বাচনেই নয়, পরবর্তী সময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইনেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকার ঐ সংশোধনী অধ্যাদেশে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞা থেকে প্রতিরক্ষা কর্ম বিভাগগুলো বাদ দেয়। এবার সেখানে আশাবাদের খবর। মানুষ তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবে, এ আশা ও নিশ্চয়তা গণতন্ত্রকামী যে কারোর জন্যই অত্যন্ত কাঙ্ক্ষিত। তাই নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগটি প্রশংসনীয়। আন্তর্জাতিক মহলও আশা করে, আমাদের আগামী জাতীয় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে। প্রত্যাশার পারদের এমন সময়ে সেনাবাহিনীকে দুষ্টের ঘণ্টা আর বাজতে বা বাজাতে দেওয়া যায় না। এর লাগাম টানতেই হবে।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট