(ভিডিও) ইরান যুদ্ধ: লক্ষ্যহীন ট্রাম্প, মোদির সঙ্গে বৈঠকে নেতানিয়াহুর সেই ঘোষণা

SHARE

য়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ  ২৪.ম,আন্তর্জতিক প্রতিনিধি,রোববার   ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ||  বৈশাখ ৬ ১৪৩৩ || ১ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি :

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধে দুই সপ্তাহের বিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে এখনো অনেক অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে যে বিষয়টি ছয় সপ্তাহ আগেও যেমন পরিষ্কার ছিল, আজও তেমনই পরিষ্কার। সেটি হলো—এই যুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই, কিন্তু বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর আছে।

ইসরায়েলের যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল ইরান রাষ্ট্রের সক্ষমতাকে সর্বোচ্চভাবে দুর্বল করে দেওয়া। তাদের লক্ষ্য ছিল সরাসরি সরকার বদল নয়, বরং ইরানের রাষ্ট্র কাঠামোকেই ভেঙে ফেলা।

Advertisement

অপরাধমূলক সংবাদ পাঠান
——————————-
আপনি অপরাধমূলক সংবাদ পাঠাতে পারেন লিখা ও ভিডিও এবং চিত্রসহ প্রধান সম্পাদক মোঃ ইসমাইল হোসেন দ্বায়ী থাকবেন। আপনার নাম ও ঠিকানা এবং মোবাইল নাম্বার গোপন থাকবে। লিখুন আমার ফেইজ বুকে Md Ismail Hossain অথবা ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম।মোবাইল: ০১৭১৪৪৯৭৮৮৫
——————————————

যুদ্ধবিরতি হলেও নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এটি ‘অভিযানের শেষ নয়’ এবং যেকোনো সময় আবার যুদ্ধ শুরু করার প্রস্তুতি তাদের রয়েছে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ কৌশলবিদ হিসেবে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদের এই অস্থির ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে তার চূড়ান্ত লক্ষ্য—‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন।

ইসরায়েলের ডানপন্থীদের কাছে ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ অনেক সময় কেবল ভূখণ্ড বাড়ানোর ধারণা হিসেবে দেখা হয়। অর্থাৎ, ইসরায়েল যে অঞ্চলগুলোকে নিজের বলে দাবি করে, সেগুলোর পরিধি আরও বিস্তৃত করার ধারণাকেই তাঁরা ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ বলে ভাবেন।

এই ব্যাখ্যা অবশ্য আংশিক সত্য। কারণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ইসরায়েলের বিস্তার ঘটেছে এবং এর ফলে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ ও সম্পত্তি হারানোর ঘটনা ঘটেছে। এখন তা আরও দ্রুতগতিতে চলছে।

গত আড়াই বছরে গাজাকে কার্যত ধ্বংস করে আবার তা দখল নিয়েছে ইসরায়েল। এতে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে এবং গাজার বেসামরিক অবকাঠামো প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।

এক হিসাবে, গত বছর গাজার জনগণকে তাদের আগের ছোট্ট ভূখণ্ডের মাত্র ১২ শতাংশ জায়গার মধ্যে গুটিয়ে ফেলা হয়েছে। অন্যদিকে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ধ্বংস ও উচ্ছেদের যে অভিযান চলছে, তা ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড়। সেখানে ইসরায়েল তার নিয়ন্ত্রণ ও বসতি স্থাপনের পরিধি ক্রমাগত বাড়াচ্ছে।

নেতানিয়াহু তাঁর বৃহত্তর পরিকল্পনার কিছু অংশ প্রকাশ্যেও বলেছেন। যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন আগে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেন, তিনি মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে বা তার ভেতরে একটি ‘ষড়্ভুজ জোট’ তৈরি করতে চান, যেখানে থাকবে ভারত, আরব দেশগুলো, আফ্রিকার দেশগুলো, ভূমধ্যসাগরীয় দেশ (যেমন গ্রিস ও সাইপ্রাস) এবং এশিয়ার অন্যান্য দেশ। এই জোটের কেন্দ্রবিন্দু হবে ইসরায়েল।

২০২৪ সালে বাশার আল-আসাদের পতনের পর ইসরায়েল সিরিয়ার ভেতরে (অবৈধভাবে দখল করা গোলান মালভূমি ছাড়াও) নতুন অঞ্চল দখল করেছে এবং দক্ষিণ লেবাননে আবার দখলদারির অঞ্চল তৈরি করছে।

ইসরায়েলের সরকারে থাকা ‘রিলিজিয়াস জায়োনিজম’ ও ‘জিউইশ পাওয়ার’ গোষ্ঠীর মন্ত্রীরা এবং লিকুদ দলের সংসদ সদস্যরা প্রকাশ্যে লেবাননে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব ও বসতি স্থাপনের দাবি তুলছেন। অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোৎরিচ ইসরায়েলকে ‘দামেস্ক পর্যন্ত বিস্তৃত’ করার কথা বলেছেন। নেতানিয়াহু নিজেও এই ধারণার সঙ্গে নিজের গভীর সংযোগের কথা জানিয়েছেন।

তবে ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ শুধু ভূখণ্ড বাড়ানোর ধারণা নয়, এটি একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত পরিকল্পনাও। জমি দখল করা তুলনামূলকভাবে সহজ অংশ; আসল লক্ষ্য আরও বড়। সেটি হলো—নতুন জোট গড়ে তুলে এবং শক্তির ওপর নির্ভরতা তৈরি করে একটি প্রভাবশালী আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা।

এই পরিকল্পনা বুঝতে হলে কয়েক বছর পেছনে যেতে হয়। ৭ অক্টোবর ইসরায়েলিদের ওপর ভয়াবহ হামলার পর এবং গাজায় ইসরায়েলের কঠোর প্রতিক্রিয়ার ফলে আরব দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা থমকে যায়। তখন নেতানিয়াহুর সামনে দুটি পথ ছিল—ফিলিস্তিনিদের প্রতি কিছুটা সহনশীল হয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা, অথবা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি অস্বীকার করে কঠোর অবস্থানে থাকা। তিনি দ্বিতীয় পথই বেছে নেন।

এর জন্য ইরানে হামলা করে তাকে দুর্বল করে দেওয়া প্রয়োজন ছিল। কারণ ইরানকে এই অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্য রক্ষাকারী হিসেবে দেখা হয়। আর সেই হামলা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি ও বড় ধরনের সামরিক সহায়তায়ই সম্ভব ছিল।

তখন নেতানিয়াহুর সামনে দুটি পথ ছিল—ফিলিস্তিনিদের প্রতি কিছুটা সহনশীল হয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা অথবা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি অস্বীকার করে কঠোর অবস্থানে থাকা। তিনি দ্বিতীয় পথই বেছে নেন।

এর জন্য ইরানে হামলা করে তাকে দুর্বল করে দেওয়া প্রয়োজন ছিল। কারণ, ইরানকে এই অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্য রক্ষাকারী হিসেবে দেখা হয়। আর সেই হামলা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি ও বড় ধরনের সামরিক সহায়তায়ই সম্ভব ছিল।

ইরান যুদ্ধের ঠিক আগে, ইসরায়েলের দুই প্রভাবশালী সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা লিখেছিলেন—ইরানের সরকারকে দুর্বল বা উৎখাত করা গেলে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলই হবে ‘প্রধান শক্তি’।

এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুধু ইরানকে দুর্বল করাই নয়, একই সঙ্গে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশগুলোর সদস্য বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে দুর্বল করে তাদের নিরাপত্তা ও জ্বালানি রপ্তানির জন্য ইসরায়েলের ওপর নির্ভরশীল করে তুলতে হবে। অর্থাৎ, এই দেশগুলোর ওপর ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রভাবকে ইসরায়েলের জন্য অনাকাঙ্ক্ষিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়, বরং পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই দেখা যেতে পারে।

যুদ্ধ শুরুর পর দেখা যায়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্ববাজারে যাওয়ার পথ গুরুতরভাবে ব্যাহত হয়। পরে ইসরায়েল যখন ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা বাড়ায়, তখন ইরানও উপসাগরীয় অঞ্চলে পাল্টা আঘাত হানে। এই প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহু ‘হরমুজ প্রণালি’ ও বাব আল-মান্দাব প্রণালির বিকল্প পথ তৈরির কথা বলেন—যেখানে তেল ও গ্যাস পাইপলাইন আরব উপদ্বীপ পেরিয়ে ইসরায়েল হয়ে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত যাবে।

নেতানিয়াহু তাঁর বৃহত্তর পরিকল্পনার কিছু অংশ প্রকাশ্যেও বলেছেন। যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন আগে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেন, তিনি মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে বা তার ভেতরে একটি ‘ষড়ভুজ জোট’ তৈরি করতে চান, যেখানে থাকবে ভারত, আরব দেশগুলো, আফ্রিকার দেশগুলো, ভূমধ্যসাগরীয় দেশ (যেমন গ্রিস ও সাইপ্রাস) এবং এশিয়ার অন্যান্য দেশ। এই জোটের কেন্দ্রবিন্দু হবে ইসরায়েল।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর কৌশলগত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের দুই শীর্ষ কর্মকর্তার একটি সাম্প্রতিক লেখায় বলা হয়েছে, ইসরায়েল শুধু সরাসরি ভূখণ্ড দখলই করবে না বরং সীমান্তের বাইরে থেকেও সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে। তাদের মতে, ইসরায়েল হবে পুরো অঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি যা একটি নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে তুলবে এবং সেখানে ইসরায়েলের স্বার্থই প্রধান হবে।

সাম্প্রতিক বক্তৃতায় নেতানিয়াহু ইসরায়েলকে শুধু ‘আঞ্চলিক পরাশক্তি’ নয়, কিছু ক্ষেত্রে ‘বৈশ্বিক পরাশক্তি’ বলেও উল্লেখ করেছেন। তিনি এমন একটি জোট গড়তে চান, যা যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি কমে গেলেও টিকে থাকবে। এই জোটকে তিনি ব্যবহার করতে চান তথাকথিত ‘চরমপন্থী শিয়া অক্ষ’ এবং ‘উদীয়মান চরমপন্থী সুন্নি অক্ষ’-এর বিরুদ্ধে। এমনকি ইসরায়েল পরবর্তী ‘হুমকি’ হিসেবে তুরস্কের নামও উল্লেখ করেছে।

‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ নিয়ে এই আলোচনা অনেকের কাছে যুদ্ধকালীন অতিরঞ্জন মনে হতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক ইসরায়েলি নীতি বলছে, বিষয়টিকে হালকাভাবে নেওয়া ভুল হবে। দেশটির রাজনৈতিক শ্রেণি, সরকার ও বিরোধী দল, নিরাপত্তা কাঠামো এবং নতুন ডানপন্থী অভিজাতদের মধ্যে স্থায়ী যুদ্ধের মানসিকতা গভীরভাবে প্রোথিত।

তবে এই চিন্তাধারার মধ্যে অতিরিক্ত বিস্তার এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। এটি ইসরায়েলের জন্য যেমন বিপজ্জনক, তেমনি পুরো অঞ্চলের পক্ষেও অগ্রহণযোগ্য।

Advertisement

সব মিলিয়ে বলা যায়, এই ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ আধিপত্যের প্রকল্পকে ঠেকানো ও সীমার মধ্যে রাখাই যুদ্ধ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে।

  • ড্যানিয়েল লেভি ইউএস-মিডল ইস্ট প্রজেক্ট-এর সভাপতি।

    দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত