
ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম,বিনোদন প্রতিনিধি, সোমবার,০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬,২৩ ভাদ্র ১৪৩৩২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮:
ঢাকাই চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহ। নব্বই দশকে মাত্র কয়েক বছরের ক্যারিয়ারে ২৭টি সিনেমায় অভিনয় করে দর্শক হৃদয় হরণ করেন। তার অভিনয়জীবনে শাবনূরের সঙ্গে জুটি বেঁধে অধিক আলোচিত হয়েছেন। একাধিক সিনেমায় একসঙ্গে অভিনয়ের সুবাদে সেই সময় তাদের ঘিরে প্রেমের গুঞ্জনও ছড়িয়েছিল।
-
Advertisement

-
আপনি অপরাধমূলক সংবাদ পাঠাতে পারেন লিখা ও ভিডিও এবং চিত্রসহ প্রধান সম্পাদক মোঃ ইসমাইল হোসেন দ্বায়ী থাকবেন। আপনার নাম ও ঠিকানা এবং মোবাইল নাম্বার গোপন থাকবে। লিখুন আমার ফেইজ বুকে Md Ismail Hossain অথবা ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম।মোবাইল: ০১৭১৪৪৯৭৮৮৫,০১৮০৬৬৭৬৬৬৩
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর, মৃত্যুবরণ করেন সালমান শাহ। তার মৃত্যু নিয়ে তৈরি হয়েছে রহস্য। সময়ের সঙ্গে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক সামনে এসেছে। সালমানের পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে ‘হত্যার’ অভিযোগ তোলা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে তার স্ত্রী সামিরা হকের দিকেও সন্দেহের আঙুল উঠেছে। মৃত্যুর আগে সালমান শাহর সঙ্গে ঠিক কী হয়েছিল, সেই ঘটনা বর্ণনা করেছেন সামিরা। ২০১৭ সালে রাইজিংবিডিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো—

ভালোবেসে ঘর বাঁধার সিদ্ধান্ত নেন সালমান শাহ-সামিরা হক। ১৯৯২ সালের ১২ আগস্ট, বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তারা। প্রেম পরিণয় পেলেও সুখের সময় খুব বেশি দীর্ঘ হয়নি বরং তা গভীর শোকে রূপ নেয়
রাইজিংবিডি: সালমান শাহর মৃত্যুর দিনই না কি তার সঙ্গে পপির মিটিংয়ের কথা ছিল?
সামিরা: ইমন যেদিন মারা গেল, সেদিন সোনারগাঁয়ে বাদল খন্দকার, পপির সঙ্গে আমার ও ইমনের দেখা করার কথা ছিল। পপিকে জিজ্ঞেস করেন—৬ তারিখ (৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে পরবর্তী সিনেমা নিয়ে সোনারগাঁয়ে বাদল খন্দকারের সঙ্গে কি আপনার, সামিরা ভাবি আর ইমনের দেখা করার কথা ছিল কি না!
রাইজিংবিডি: আপনি রাগ করে মায়ের কাছে চলে গিয়েছিলেন। সালমান শাহ কীভাবে আপনার রাগ ভাঙালেন?
সামিরা: শাবনূরকে নিয়ে যখন ঘটনাগুলো ঘটে, তখন বলেছিলাম, ‘আমি ফিরব, যদি তুমি শাবনূরের সঙ্গে সিনেমা না করো। শাবনূর যদি থাকে, তবে আমি তোমার সঙ্গে থাকব না। আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দাও। তুমি আমাকে ডিভোর্স দাও বা আমি তোমাকে দিই।’ ইমন বলে, ‘আমি তো তোমাকে ডিভোর্স দেব না। তোমাকে ছাড়া আমি থাকবই না। তুমি আমার সঙ্গে চল। আমি শাবনূরের সঙ্গে সিনেমা করব না। টাকা নেওয়া আছে এমন তিন-চারটা সিনেমার ডাবিং বাকি আছে, ডাবিংয়ের সময়েও তুমি আমার সঙ্গে থাকবে।’ প্রত্যেকটাতে আমি উপস্থিত থাকব বলেই তো ডাবিংয়ে গেছিলাম। না হলে তো আমার যাওয়ার দরকার ছিল না।
রাইজিংবিডি: কোন সিনেমার ডাবিংয়ে গিয়েছিলেন?
সামিরা: ‘প্রেম পিয়াসী’ সিনেমার। আমি সারাক্ষণ ওর সঙ্গেই থাকতাম। ওই সময়ে আমার তো বাচ্চাকাচ্চা ছিল না। সারাক্ষণ ইমনের সঙ্গেই থাকতাম, ইমনও আমার সঙ্গে থাকত। আমাকে ছাড়া ইমন থাকতে চাইত না। কী হয়েছিল তা এফডিসির ওয়ার্ড বয়ের কাছে জিজ্ঞেস করেন!

‘প্রেম পিয়াসী’ সিনেমায় জুটি বেঁধে অভিনয় করেন সালমান শাহ ও শাবনূর। ১৯৯৭ সালে ১৮ এপ্রিল প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় সিনেমাটি
রাইজিংবিডি: তারপরে কী হয়েছিল?
সামিরা: ওখানেই শাবনূর বারবার ওকে (ইমন) জড়িয়ে ধরছিল, চুমু খাচ্ছিল। আমি সেটা নিতে পারছিলাম না। ডাবিংয়ের মাঝে ব্রেকে বারবারই কানে কানে ইমনের সঙ্গে কথা বলছিল। তখন আমি রাগ হয়ে গেলাম। আমার অভিমানটা কোথায় জানি একটু গায়ে লাগল!
রাইজিংবিডি: আপনি কী তখন ওখানে বসে কিছু বলছিলেন?
সামিরা: না, আমি কাকে কী বলব? জুনিয়র মানুষ। ওখানে ডিরেক্টর বসা, প্রোডিউসার বসা। আমি কাকে বলব? আমি আমার শ্বশুরকে বলেছিলাম। আমার শ্বশুরের সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। আমি বলি, ‘আব্বা, আমি থাকব না, চলে যাব।’ ইমন যখন দেখল আব্বা ও আমি উঠে গেছি, তখন তখন আব্বা ইমনকে বললেন, ‘সামিরা তো চলে যেতে চাচ্ছে; আমিও যাচ্ছি।’ তখন সে বলে, ‘কেন, কী হলো?’ বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছে। কারণ আমি তো জানি, সে আমার দিকে তাকাবে, আমার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করবে। তারপর আমি ডাবিং রুম থেকে বের হয়ে গেছি। সে-ও আমার সঙ্গে বের হয়ে বলছে—‘কী হয়েছে?’ আমাকে ‘জানু’, ‘লক্ষ্মী’ বলে ডাকত। ইমন বারবার বলছে—‘কী হয়েছে, কী হয়েছে?’ শুরুতে আমি কোনো কথাই বলছিলাম না। পরে বলি, ‘বাসায় যাব।’
রাইজিংবিডি: এটা কত তারিখের ঘটনা?
সামিরা: ৫ তারিখ (৫ সেপ্টেম্বর) রাতের ঘটনা। তারপর গাড়িতে উঠে গেলাম। ইমন তখন বলল, ‘রেজা ভাই, প্যাকআপ করেন, আমার শরীর খারাপ লাগছে।’ প্যাক করল। শাবনূরের সঙ্গে ইমন কোনো কথা বলল না, খোদা হাফেজও বলল না। ইমন চুপিচুপি আমার পিছে পিছে বের হয়ে আসল। কারণ আমি তো আগেই বের হয়ে আসছি। বেরিয়ে ওকে তো গাড়ি বের করতে হবে। বুঝতে পারছে যে, বউ রাগ হয়েছে। বউকে তো মানাতে হবে। বউ তো মাত্র দুদিন আগে ফেরত আসছে। এগুলো সত্যি। আপনারা যেগুলো জানতে চান, এগুলো সত্যি। এগুলো আমি করেছি।

‘প্রেম পিয়াসী’ সিনেমার ডাবিং রুম থেকে রাগ করে বেরিয়ে আসেন সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা হক
রাইজিংবিডি: বাসায় আসার পর কী হলো?
সামিরা: আমরা বাসায় একা আসি নাই, বাদল ভাইও আমাদের সঙ্গে আসেন। বাদল ভাই তখন কী একটা পেমেন্টের টাকা দিলেন। দেখলাম, দেড় লাখ টাকা। ইমন তখন বলল, ‘আমার বাসায় চলেন। গাড়িতে ওঠেন বাদল ভাই।’ বাদল ভাই গাড়িতে উঠলেন। পিছের সিটে বসলেন, আমি সামনে বাঁ দিকের সিটে বসে আছি। কোনো কথাই বলছি না। জানালার দিকে তাকিয়ে আছি। ইমন বলছে, ‘আমার বউটা রাগ হয়ে গেল।’ বাদল ভাই বললেন—‘আরে না, ভাবি ঠিক হয়ে যাবেন। আমাদের লক্ষ্মী ভাবি।’ প্রথমে বোঝে নাই কী কারণ। আমি তো কোনো কথা বলছি না। বাসায় আসার পরে বাদল ভাই, ইমন বলল, ‘খানা দাও।’ মানে, বিষয়টা ও নরমাল করার চেষ্টা করছিল। আমিও আর কথা বাড়াইনি। তারপর খানা বাড়লাম। তিনজন খেতে বসলাম। আমি খাচ্ছিলাম না। ইমন আবার রাতে আমার হাতে ছাড়া খাবার খেত না। ইমন প্রচুর পাগলামি করত। এর আগে ঢাকা মেট্রোপলিটনে ওয়াশ করতে হইছে। অ্যারোসলের সঙ্গে হারপিক মিক্সড করে খেয়ে ফেলেছিল। অ্যারোসল, হারপিক আর স্যাভলন—তিনটা একসঙ্গে খেয়েছিল।
রাইজিংবিডি: বাসায় আপনারা তিনজনই ছিলেন?
সামিরা: না, কাজের লোকও ছিল। কাজের দুজন বুয়া ছিল—ডলি আর ডলির ছেলে ছিল। ওদের (বাদল খন্দকার, সালমান শাহ) খাবারদাবার বেড়ে দিলাম। সবাই সুন্দরমতো খাচ্ছেন। ইমন একটু আহ্লাদ করত বেশি। বলত, ‘আমার বউ তো খাওয়ায়ে দিচ্ছে না আমাকে।’ তো ভাই বললেন, ‘আমি কি একা খাব? তোমরা খাচ্ছ না?’ ইমন বলছে, ‘কীভাবে খাব? আমার বউ তো খাওয়ায়ে দিচ্ছে না।’ ভাই আবার বলছে, ‘আজকে একটু খাও। পরে খাইয়ে দেবে। আজকে ভাবির মনটা ভালো না।’ ইমন বলল, ‘না, থাক, খাব না।’ এরকম করছে ইমন।
তারপর খাবার মাখিয়ে ওকে খাইয়ে দিলাম। ইমন আমাকে বলল, ‘তুমি খাও।’ ওকে একবার খাওয়াই, নিজে একবার খাই—এ রকম করে খেলাম। প্রথমে আমরা বেডরুমে বসেছিলাম। ওর ঘাড়টা ব্যথা করছিল, তাই শুয়ে ছিল। বাদল ভাই সামনের চেয়ারে বসে কথা বলছিলেন। আমি রান্নাঘরে বুয়ার সঙ্গে খাবার রেডি করছিলাম। খাবার বেড়ে ডাকলাম, ওরা আসল। খেয়েদেয়ে বেডরুমে বসে আবার একটু গল্প করল। শিডিউল নিয়ে, যে দেড় লাখ টাকা নিলো ইমন, সেটার ডেট নিয়ে কথা বলছিল দেখলাম। এটা নিয়ে পরের দিন অফিসে কথা বলতে যাব আমরা। সেটা নিয়েও কথা হচ্ছিল। ইমন আমাকে ডেকে তা বারবার শুনাচ্ছিল।
বাদল ভাই যাওয়ার সময় আমাকে লাউডে বললেন, ‘ভাবি, বিষয়টা আর বাড়িয়েন না। ও আর এমন করবে না। শাবনূরের সঙ্গে আর সিনেমাই করবে না।’ সব কন্ট্রাক্ট পেপার ছিঁড়ে ফেলল। তারপর বাদল ভাই চলে যান। যাওয়ার সময় বললেন, ‘ভাবি, কালকে একটু আপনি অফিসে যাইয়েন। আপনি না গেলে আবার যাবে না। ওরা তো ইমনকে যেতে বলছিল। হিরো যাবে না, এটা কেমন?’ তখন আমি বললাম, ‘আচ্ছা, যাব।’

সালমান শাহ ও শাবনূর জুটি বেঁধে ১৪টি সিনেমায় অভিনয় করেন
তারপর আমরা বেডরুমে গেলাম। ১০-১৫ মিনিটের মতো চেঞ্জ করতে লাগল। এরপর ফোনটা বেজে উঠল। ইমন কেটে দিল ফোনটা। তখন মোবাইল রেখে ও রেডি হচ্ছিল। তারপরে সে কথা বলতে বলতে আবার সেকেন্ড টাইম ফোন করল। তারপর হঠাৎ করে লাফ দিয়ে উঠে ফোনটা নিয়ে বাথরুমে চলে গেল। ‘আমাকে কেন না বলে চলে গেলেন? অভিমান করে…।’—ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে এ রকম কোনো একটা কথা বলছিল। একটা মেয়ের আওয়াজ ছিল। আমি আরো বিরক্ত হলাম। আড়াই মাস পর বাসায় আসলাম। এমনিতেই প্রবলেম, দুই দিন ধরে ঘর পরিষ্কার করছি। সবকিছু গোছালাম। মাত্র সংসার আবার শুরু করলাম। ডাবিংয়ে গিয়ে দেখি শাবনূর একটা ফোটাও বদলাল না। আবার বাসায়ও এখন ফোন করছে।
এরপর আমি বাসা থেকে বের হয়ে গেলাম। একদম নিচে চলে গেলাম। নিচে গিয়ে ট্যাক্সির জন্য দাঁড়িয়ে আছি। তখন তো এগুলো ছিল না, নরমাল ট্যাক্সিগুলো ছিল। নিচে গেটের দারোয়ান বলল, ‘ভাবি, কই যান? আপনি তো কখনো ট্যাক্সিতে ওঠেননি।’ আমি তাকে বললাম, ‘দেখো তো, একটা ট্যাক্সি ডাকো। আমি বনানী যাব। তোমরা কেউ একজন আমার সঙ্গে যাবে।’ বনানী আমার দাদাবাড়ি। সেখানে আমার ফুফু থাকেন। আমি চেয়েছিলাম সেদিন ওখানে চলে যেতে। ইমন বাথরুম থেকে এক মিনিটের মধ্যে বের হয়ে আসছে। এসে দেখে আমি নাই। ও এগারো তলা থেকে চিৎকার করেছে, ‘এই, তোমরা যদি ভাবিকে বের হতে দাও, তোমাদেরকে এক্ষুণি গুলি করব। এক্ষুণি ভাবিকে উপরে আনো, আমি আসতেছি।’ এরই মধ্যে আমি উপরে উঠে গেলাম। ওরা ভয় পাচ্ছিল খুব। বলছিল, ‘ভাবি, ভাই রাগ করছে, আমাদেরকে মেরে ফেলবে। আপনি তো বোঝেন, আপনি উপরে যান।’ ওরা জানত আমি রাগী না। চার বছর থাকছি ওখানে। ওরা বুঝত। আমি চুপ করে উপরে উঠে গেলাম। দেখলাম, ইমন খুব রেগে আছে। আমি আর বিষয়টা বাড়ালাম না।
ইমন কতক্ষণ কাঁদল, বসে বসে কিছু একটা পান করল। আমি কোনো কথা বললাম না, আমি গান শুনলাম। কাঁদছিলাম বসে বসে। আমি কাঁদলে ও সহ্য করতে পারে না। ইমন সহ্যই করতে পারত না আমার কান্না। অথচ এখন পর্যন্ত কাঁদাচ্ছে। এখন হয়তো ফোনে কথা বলছি, তাই হেসে কথা বলছি মনে হচ্ছে। যদি সামনে আসেন, তখন দেখবেন। আমি আসলে সেভাবে রেডি হয়ে কাঁদতে পারি না। যখন আসে, আসেই। ইমন আমার কান্না দেখেই তো বের হয়ে আসছে। বলছে, ‘তোমার সবকিছু করে দিব কালকে। তুমি রাগ হয়ো না। তুমি আমাকে মাফ করে দাও। আমি তোমার চোখের দিকে তাকাতে পারছি না। আমি কোনো দিনও কিছু করিনি। এটাই আমার প্রথম ভুল, এটাই লাস্ট। আর সিনেমা করব না। আমাদের টাকা জমুক, আমরা কানাডা চলে যাব।’ তখন তো কানাডায় যেতে মাত্র ২০ লাখ টাকা লাগত। ওর ঘাড়ে ব্যথা করছিল, শরীরে ব্যথা করছিল। ইমন বলল, ‘আর কয়েকটা ভালো সিনেমা অন্য অভিনেত্রীদের সঙ্গে করে, কিছু টাকা হলে আমরা বিদেশে চলে যাব।’

স্ত্রী সামিরা হককে নিয়ে কানাডায় পাড়ি জমানোর পরিকল্পনা করেছিলেন সালমান শাহ। কিন্তু তার আগেই পরপারে পাড়ি জমান নব্বই দশকের তুমুল জনপ্রিয় এই তারকা
রাইজিংবিডি: তারপরে কী করলেন? ঘুমাতে গেলেন? আপনার রাগ তখন ছিল না কি স্বাভাবিক হয়েছিলেন?
সামিরা: রাত আড়াইটার বেশি বাজে। দুজনের চোখে ঘুম ছিল না, অভিমান ছিল ভিতরে ভিতরে। রাগ তো আর একদিনে চলে যায় না। আমি কি বলব, আমার রাগ চলে গেছে? রাগের থেকে কষ্ট অনেক বেশি ছিল। ইমনও কাঁদছে, আমিও কাঁদছি। ও বারবার আমার কাছে আসতে চাচ্ছে। কিন্তু আমি কেন জানি নরমাল হতে পারছিলাম না। এগুলো ও বলছিল, ‘তুমি কেন ভুলতে পারছ না? আমি কথা দিচ্ছি, আর হবে না।’ আপনি এসব কথা ডিবিতে গেলেও শুনবেন। নাইটি সেভেনের শেষে আবার সিআইডি-তে গিয়েছিলাম, ওখানেও একই কথা শুনবেন। আমার বলা স্টেটমেন্টের কথা শুনবেন। আর ওদেরটাও শুনবেন। হ্যাঁ, ওরা একবার বলবে ফ্যানের তার। একবার বলবে ফোনের কর্ডের তার। একবার বলবে ইনজেকশন পুশ। কি দিয়ে মারা গেছে ইমন, আমি জানতে চাই।
তারপর আমরা দুজনেই শুয়ে পড়লাম। ও একটা গান ছাড়ল। একটা ক্যাসেটও আমার জন্য রেকর্ড করে রাখছিল, যখন আমি চট্টগ্রামে ছিলাম। আমার অভিমান ভাঙানোর জন্য আমার সব পছন্দের গান একত্র করে রেকর্ড করেছিল। তখন সিডি প্লেয়ার ছিল না, ক্যাসেট প্লেয়ার ছিল। সিডি ছিল, কিন্তু তখন ইংলিশ সিডিগুলো কেনা যেত। এক জায়গায় সব পাওয়া যেত না। দু-একটা জায়গায় পাওয়া যেত। যাই হোক, তখন সে সুন্দর করে রেকর্ড করেছে। ওখানে সব আমার পছন্দের গানগুলো সে শোনাচ্ছিল। আমরা শুয়ে থাকলাম। ওর আগে আমার চোখ লেগে গেল। ও কখন ঘুমিয়েছে, আমি জানি না। আমি আগে ঘুমিয়েছি। তারপর সকালবেলা কাজের মেয়ে ডলি আসল। ডলি এসে বলল, ‘ভাবি, ইমন ভাইয়ার আব্বা আসছেন।’ আমি বললাম, ‘আব্বাকে বসাও, আমি আসছি।’ আমি সেদিন স্কার্ট পরেছিলাম। আমার মনে আছে, এখনো আমি কাপড়টাও ধুইনি। আমি আর এসব বিষয়ে কথা বলতে চাচ্ছি না। ইমোশনাল হয়ে যাব। কী জানতে চান, প্রশ্ন করেন, আমি বলছি।
রাইজিংবিডি: আপনার শ্বশুর আসছিলেন। আপনি তখন কথা বলছিলেন। সেই সময়ে সালমান শাহ কোথায় ছিলেন?
সামিরা: ও তো বেডরুমে ঘুমাচ্ছিল। আব্বা আমার সঙ্গে বসে বলল, ‘৫০ হাজার টাকা লাগবে, দাও তো মা। আমাকে নাস্তাও দাও। তোমার আম্মাকে এখন নাস্তা দিতে বললে বকাবকি করবে।’ আমি জানি আমার শাশুড়ি কেমন, কী করতেন, কাজের লোকদের কীভাবে অত্যাচার করতেন। আমি ওখানে ছিলাম। সবই আমার নিজের চোখে দেখা। উনি যদি সন্দেহ করতেন, তাহলে নাস্তা কীভাবে গিলল, আমাকে বলেন তো? এখন ভদ্রলোক মারা যাওয়ার পরে এই গল্প না! বেঁচে থাকতে তো এই গল্প ছিল না। যখন বেঁচে ছিল, আমার শ্বশুর কেন কোনোদিনও এই গল্প কারো কাছে বললেন না? যাই হোক, আমি টাকাটা নিতে বেডরুমে গেলাম। তখন দরজাটা খোলা ছিল। তখনকার দরজা তো নিজে নিজে লেগে যায় না। ইমন শুয়ে ছিল।

সামিরা হক
আমি বললাম, ‘আব্বা, ইমনকে ডাকব?’ উনি বললেন, ‘না না, ইমনকে ডেক না, ঘুমাক।’ আমার শ্বশুরের ছেলের জন্য অনেক ফিলিংস ছিল। আমার শ্বশুর কি বাঁচতে পারল? ছেলের কষ্টে মারাই গেল। উনার (সালমান শাহর মা) মতো শক্ত মহিলা না কি! একুশ বছরের ছেলে মারা যাওয়ার পরও স্বাভাবিক। যখন ইচ্ছা টিভিতে চলে আসে। যাই হোক, টাকা নিয়ে আব্বা বললেন, ‘ইমন উঠলে আমাকে ফোন করতে বলো।’ বললাম, ‘আচ্ছা আব্বা।’ তারপর আব্বা চলে গেলেন। রাতে আমার ঘুমটা ঠিক করে হয় নাই, ভাঙা ভাঙা ছিল। আব্বা যাওয়ার পরে ইমনের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ি। তারপর ডলি আবার আমাদের রুমে আসল। আমি শুয়ে থাকা অবস্থায় নিশ্চয়ই আব্বা আমাদের বেডরুমে আসবেন না। ডলি এসে বলছে, ‘ভাবি, আধ ঘণ্টা হয়ে গেল, ভাইয়ার কোনো সাড়া-শব্দ নাই। আমি ডাকছি। ওমর গোসল করল।’ ওখানে ওমরের একটা আলমারিও ছিল। ওর জন্য ছোট্ট একটা আলমারি করে দিয়েছিলাম।
রাইজিংবিডি: মানে সকালবেলায় আপনি যখন তার পাশে গিয়ে শুইলেন, তারপর সে উঠে গেছে। কিন্তু আপনি টের পাননি, ব্যাপারটি কী এরকম?
সামিরা: না এরকম না। ইমন উঠে গেছে, তা আমি টের পেয়েছি ১১টার দিকে। উঠে বাথরুমে গেল, আমার সঙ্গে চোখাচোখি হলো। ঘুমের মধ্যেই আমি আবার তাকালাম। সেও আমার দিকে তাকাল। সে বাথরুমে গেল। আমি আবার চোখটা বন্ধ করে রাখলাম। চোখটা আবার লেগে গেল। তারপর সে বাথরুম থেকে কখন বের হলো, সেটা আমি বলতে পারব না। আমি ঘুমিয়ে গেছিলাম। ডলি এসে আমাকে ডাকল। আমি তখন লাফ দিয়ে উঠলাম। উঠে বললাম, ‘কেন, কী হইছে? আরো ধাক্কাও।’ নরমালি যেটা বলি।
ডলি বলল, ‘না, ওমরের কাপড় ভিতরে। ওমর গোসল করল। এতক্ষণ হয়ে গেল। ভাইয়াকে বলছি, ওমরের গায়ে কাপড় নাই। ভাইয়া সাড়া দিচ্ছে না।’ ওমর দরজা ধাক্কাচ্ছে। তারপর গিয়ে আমিই দরজা ধাক্কালাম। তারপর দেখি, সত্যিই কোনো সাড়া-শব্দ নাই। এরপর আবুল ভাইকে ডাকলাম বাসার এক্সট্রা চাবির জন্য। আবুল ভাই দ্রুত আসলেন। আবুল ভাইকে বললাম, ‘চাবি কোথায়?’ আবুল ভাই চাবি নিয়ে আসলেন। কিন্তু বুঝতে পারছিলেন না চাবি কোনটা। এটা তো সেকেন্ড ঘর। এমন তো না যে বেডরুম। ঘটনা তো ঘটেছে গেস্ট রুমে।

সালমান শাহর মৃত্যুর পর কেটে গেছে তিন দশক। তারপরও প্রিয় তারকাকে নিয়ে তার ভক্ত-অনুরাগীদের ভালোবাসা এতটুকুও কমেনি
-
Advertisement

তারপর আমি দরজা খুললাম। দরজা খুলে যা দেখার দেখলাম। চিৎকার দিয়ে আমি পা ধরলাম। তারপর উপরে ঠেলার চেষ্টা করলাম। বুঝতেছিলাম না কী করব। আমরা চারজনই চিৎকার করছিলাম। বাসায় চারজন ছিলাম। আবুল রাতে থাকত না, সকালে আসলে রাতে চলে যেত। বললাম না, আবুল ছিল আর দুইটা বুয়া ছিল—মনোয়ারা, ডলি। আমরা চারজন মিলে ইমনকে নামালাম। ইমন তখন ভারী হয়ে গেছে। সিঁড়ি থেকে নামিয়ে আমার পায়ের মধ্যে মাথা রাখা হলো। নিজের ভাই-বোন, বাচ্চা, হাজবেন্ড সুইসাইড করলে আপনি পুলিশের জন্য অপেক্ষা করবেন? আমি তো ভাবছি ও বেঁচে আছে। কারণ ওর তো ভয়ংকরভাবে জিভ বের হয় নাই। ওরকম হয় নাই। কারণ এইটা ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে ঘটেছে।



