ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম,বিশেষ প্রতিনিধি, বুধবার ০৮ জুলাই ২০২৬ || আষাঢ় ২৪ ১৪৩৩ || ২২ মহররম ১৪৪৮ হিজরি :
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত নবম জাতীয় পে স্কেলের সুপারিশ আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতির পর অর্থ বিভাগের প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় পাঠাবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে জানিয়েছে, রাজস্ব পরিস্থিতি, বাজেট সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতি বিবেচনায় নতুন পে-স্কেলের প্রথম ধাপে মূল বেতন একবারে কার্যকর এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ভাতা পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে গত ৬ জুলাই অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়।
সূত্র জানায়, আগামী মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রস্তাবটি উপস্থাপন সম্ভব না হলে পরবর্তী বৈঠকে তা তোলা হবে। এরপর অনুমোদন মিললে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নসংক্রান্ত কমিটির অধিকাংশ সুপারিশ ইতোমধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে। বেসামরিক, সামরিক ও বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের বেতন কাঠামোর মধ্যে সমন্বয় এবং বিচার বিভাগসংক্রান্ত কয়েকটি কারিগরি বিষয় নিষ্পত্তির পর চূড়ান্ত প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে শুরুতে তিন ধাপের একটি পরিকল্পনা বিবেচনায় ছিল। ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে নতুন মূল বেতনের অর্ধেক, পরবর্তী অর্থবছরে বাকি অর্ধেক এবং এরপর বিভিন্ন ভাতা কার্যকর করার চিন্তা করা হয়েছিল। তবে, এ ধরনের বাস্তবায়ন পদ্ধতিতে কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ, ইনক্রিমেন্ট সমন্বয় এবং পুরোনো ও নতুন কাঠামোর মধ্যে হিসাব মেলাতে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।
এ অবস্থায় এখন নতুন মূল বেতন এক ধাপে কার্যকর করার বিকল্পটি অধিক গুরুত্ব পাচ্ছে। এতে বেতন নির্ধারণ সহজ হবে এবং প্রশাসনিক জটিলতাও অনেকাংশে কমবে।
অন্যদিকে; বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ বিভিন্ন ভাতা পরবর্তী অর্থবছরে পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। তবে, বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। মন্ত্রিসভার অনুমোদন এবং সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির পরই বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি জানা যাবে।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হলো ইন্টিগ্রেটেড বাজেট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম (আইবাস) হালনাগাদ করা। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ইনক্রিমেন্ট, বকেয়া এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধার হিসাব এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী সফটওয়্যারকে প্রস্তুত না করে বাস্তবায়নে যাওয়া সম্ভব নয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ধাপে ধাপে মূল বেতন কার্যকর করা হলে সফটওয়্যারে আলাদা করে বেতন নির্ধারণ, ইনক্রিমেন্ট হিসাব, বকেয়া সমন্বয় এবং ভাতা নিরূপণে অতিরিক্ত জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ কারণেই মূল বেতন একবারে কার্যকর করার পক্ষে মতামত জোরালো হয়েছে।
তবে, সফটওয়্যার হালনাগাদ করাই একমাত্র কাজ নয়। প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বর্তমান মূল বেতন, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, পদ, গ্রেড, চাকরির অবস্থান এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধার তথ্য যাচাই করে নতুন বেতন নির্ধারণ করতে হবে। এরপর হিসাবরক্ষণ অফিসগুলোকে নতুন বেতন বিল প্রস্তুত করতে হবে। এসব প্রশাসনিক কার্যক্রম শেষ হতে কিছুটা সময় লাগবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন পে-স্কেলের কার্যকারিতা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ধরা হচ্ছে। বাস্তবে বর্ধিত বেতন হাতে পেতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। এ ক্ষেত্রে পরে বকেয়া অর্থ সমন্বয় করা হবে।
এর আগে, অষ্টম জাতীয় পে-স্কেলেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল। ২০১৫ সালের জুলাই থেকে সেটি কার্যকর ধরা হলেও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সংশোধিত বেতন পেয়েছিলেন ওই বছরের ডিসেম্বর মাসে। এবারো একই ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা।
বেতন বৃদ্ধির সম্ভাব্য হার সম্পর্কে এখনো সরকারিভাবে কিছু জানানো হয়নি। কারণ চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের আগে কোনো গ্রেডের নির্দিষ্ট বেতন বা ভাতার পরিমাণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
জানা গেছে, উচ্চপর্যায়ের কমিটির আলোচনায় ১ থেকে ১০ গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন প্রায় ১০০ শতাংশ বা তার কিছু কম হারে এবং ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন গড়ে প্রায় ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ বিবেচনায় রয়েছে।
কমিশনের প্রাথমিক সুপারিশে বিভিন্ন গ্রেডে মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব ছিল। তবে, সরকারের রাজস্ব আয়, বাজেট ঘাটতি, সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতা এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে চূড়ান্ত প্রস্তাবে পরিবর্তন আসতে পারে বলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মূল বেতনের সঙ্গে ১০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা এবং ৫ শতাংশ বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পাচ্ছেন। নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে এসব সুবিধা নতুন কাঠামোর সঙ্গে কীভাবে সমন্বয় করা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। মহার্ঘ ভাতা আলাদা সুবিধা হিসেবে বহাল থাকবে কি না, বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার অপরিবর্তিত থাকবে কি না কিংবা বিভিন্ন ভাতার নতুন হার কী হবে- এসব বিষয়ে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির আগে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগীর বেতন ও পেনশন বাবদ সরকারের বছরে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। কমিশনের পূর্ণাঙ্গ সুপারিশ বাস্তবায়ন করলে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। ফলে নতুন পে-স্কেলের চূড়ান্ত কাঠামো নির্ধারণে রাজস্ব আহরণ, বাজেট ঘাটতি এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর অর্থ বিভাগ নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন জারি করবে। এরপর সফটওয়্যার হালনাগাদ, কর্মচারীভিত্তিক বেতন পুনর্নির্ধারণ, হিসাব যাচাই এবং বেতন বিল প্রস্তুতের কাজ শেষ হলে সংশোধিত বেতন পরিশোধ শুরু হবে।
এদিকে, বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের নেতারা বলেছেন, সরকারি গেজেট প্রকাশের আগে পে-স্কেলের বেতনহার, ভাতা কিংবা বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সমীচীন নয়। তারা বলেন, সরকারি সিদ্ধান্ত ও গেজেট প্রকাশের পরই সব বিষয় স্পষ্ট হবে। তাই কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এখন চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনের অপেক্ষায় রয়েছেন।
নেতারা বলেন, নবম পে-স্কেলের লক্ষ্য শুধু বেতন বৃদ্ধি নয়; বরং বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, সরকারি চাকরিতে দক্ষ জনবল ধরে রাখা এবং রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বেতন কাঠামো গড়ে তোলা। এখন মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের দিকেই সবার নজর। অনুমোদন মিললেই দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আরেক কর্মকর্তা বলেন, নতুন পে-স্কেল কার্যকর করার ক্ষেত্রে শুধু বেতন বৃদ্ধি নয়, পুরো আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করাও বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন কাঠামো অনুযায়ী প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন পুনর্নির্ধারণ, তথ্য যাচাই, সফটওয়্যার হালনাগাদ এবং হিসাবরক্ষণ অফিসগুলোর প্রস্তুতি সম্পন্ন না হলে সংশোধিত বেতন পরিশোধ সম্ভব হবে না।
তিনি বলেন, পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার তারিখ ১ জুলাই ২০২৬ ধরা হলেও বাস্তবে সংশোধিত বেতন কর্মচারীদের ব্যাংক হিসাবে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। তবে, কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকে প্রাপ্য বকেয়া অর্থ পরবর্তীতে সমন্বয় করে পরিশোধ করা হবে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগী রয়েছেন। তাদের বেতন ও পেনশন বাবদ সরকারের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। কমিশনের পূর্ণাঙ্গ সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হলে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে। এ কারণে নতুন পে-স্কেলের চূড়ান্ত কাঠামো নির্ধারণে রাজস্ব আহরণ, বাজেট ঘাটতি এবং সরকারের সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। এরপর সফটওয়্যার হালনাগাদ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তথ্য যাচাই, নতুন বেতন নির্ধারণ এবং হিসাবরক্ষণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সংশোধিত বেতন পরিশোধ শুরু হবে।
বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের সভাপতি নুরুল ইসলাম বলেন, “গেজেট প্রকাশের আগে পে-স্কেলের চূড়ান্ত কাঠামো, বেতনহার বা ভাতা নিয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না।”
একই ধরনের মত দিয়েছেন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বেলাল হোসেনও। তিনি বলেন, “সরকারি গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত বেতন-ভাতা বা বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে নিশ্চিত কিছু বলা সম্ভব নয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এখন সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছেন।”
বেলাল হোসেন বলেন, “নবম পে-স্কেলের মাধ্যমে বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, সরকারি চাকরিতে দক্ষ জনবল ধরে রাখা এবং রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বেতন কাঠামো গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য। এখন মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হলেই দীর্ঘদিনের আলোচিত নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে।”
