ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম,আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি,বৃহস্পতিবার ১৬ এপ্রিল ২০২৬ || বৈশাখ ৩ ১৪৩৩ || ২৭ শাওয়াল ১৪৪৭ হিজরি :
ইরানের জনগণের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশে নজিরবিহীন মানবিক উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ভয়াবহ আগ্রাসনে ক্ষতিগ্রস্ত ইরানি বেসামরিক মানুষের সহায়তায় অনেক কাশ্মীরি নিজেদের মূল্যবান সম্পদ দান করছেন। এর মধ্যে রয়েছে অতি মূল্যবান স্বর্ণের গয়নাও। এছাড়া বছরের পর বছর ধরে মাটির ব্যাংকে জমানো অর্থও দিয়ে দিচ্ছেন তারা। কাশ্মীরের স্থানীয় সূত্র বলছে, ইতিমধ্যে সংগৃহীত সহায়তার পরিমাণ ৬০০ কোটি রুপি ছাড়িয়েছে।
শ্রীনগর থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আল জাজিরা জানায়, চলতি বছরের ২১ মার্চ ঈদুল ফিতরের দিন কেন্দ্রীয় কাশ্মীরের বুদগামের ৫৫ বছর বয়সী মাসরাত মুখতার তার বাবার দেয়া জন্মদিনের উপহার স্বর্ণের কানের দুল দান করেন ইরানের মানুষের জন্য। শুধু তিনি নন, তার আত্মীয়রাও নিজেদের মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে ইরানের পাশে থাকার জন্য এগিয়ে আসেন।
ঈদের মতো শুভ দিনে তাদের প্রথাগত আচার-অনুষ্ঠান ও উদযাপন থামিয়ে দিয়ে ১৬০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে থাকা ইরানের জনগোষ্ঠীর জন্য এই নগদ অর্থ, গৃহস্থালির জিনিসপত্র এবং ব্যক্তিগত সম্পদ দান করেছেন তারা। কাশ্মীরের বিভিন্ন এলাকায় পরিবারগুলো তামার বাসন, গবাদিপশু, সাইকেল এবং সঞ্চয়ের অর্থ দান করেছে। শিশুরাও তাদের সঞ্চিত অর্থভর্তি ব্যাংক ভেঙে দিয়েছে। দোকানদার ও ব্যবসায়ীরাও নিজেদের আয়ের একটি অংশ তুলে দিয়েছেন। তারা এসব অর্থ ইরানি জনগণের জন্য ত্রাণ তহবিলে হস্তান্তর করেন।
মাসরাত মুখতার বলেন, ‘আমরা যা ভালোবাসি, তাই দেই। এতে আমরা তাদের আরও কাছাকাছি অনুভব করি। এই ছোট ইরান (অঞ্চলটি ঐতিহাসিকভাবে এই নামে পরিচিত) তার নামের প্রতি এভাবেই দায়িত্ব পালন করে। এই বন্ধন সময় ও সংঘাতের মধ্যেও অটুট।’
ছয় শতাব্দীরও বেশি সময়ের ঐতিহাসিক সম্পর্কের গভীরে প্রোথিত এই বন্ধন যুদ্ধের সময় আরও বেশি প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। শ্রীনগরের শিয়া অধ্যুষিত জাদিবাল এলাকার বাসিন্দা ৭৩ বছর বয়সী তাহেরা জান জানান, কাশ্মীরে মেয়েদের বিয়ের জন্য তামার বাসন জমা করার ঐতিহ্য থাকলেও এবার তা ইরানের ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের জন্য দান করা হয়েছে। ২৪ বছর বয়সী ট্রাকচালক সাদাকাত আলি মীর তার জীবিকার দুটি গাড়ির একটি দান করেছেন। অনেকেই সাইকেল, স্কুটারসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী দিয়েছেন। নয় বছর বয়সী জয়নাব জানসহ শিশুরাও নিজেদের মাটির ব্যাংকে থাকা সঞ্চয় তুলে দিয়েছে।
তামার বাসনপত্র ও নগদ অর্থ দান করছেন কাশ্মীরিরা।
বিশ্লেষকদের মতে, কাশ্মীরে শিয়া মুসলিমদের সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হওয়ায় ইরানের ঘটনাবলি সেখানে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। তবে শুধু শিয়ারা নয়, সুন্নি মুসলিমরাও সরলভাবে ঈদ উদযাপন করে ইরানের সহায়তায় দিয়েছেন তাদের মূল্যবান সঞ্চয়। অনেক দোকানদার আগেভাগে দোকান বন্ধ করে দিয়েছেন, পরিবারগুলো তাদের দৈনন্দিন খরচ কমিয়েছে।
রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিরাও এই উদ্যোগে অংশ নিয়েছেন। বুদগামের আইনপ্রণেতা আগা সৈয়দ মুনতাজির মেহেদী তার এক মাসের বেতন দান করেছেন ত্রাণ তহবিলে। কাশ্মীর ছাড়াও পাকিস্তান, ইরাকসহ অন্যান্য দেশ থেকেও ইরানের পক্ষে এমন সহায়তার খবর পাওয়া গেছে।
ঐতিহাসিক বন্ধনের প্রতিফলন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাশ্মীর ও প্রাচীন পারস্যের মধ্যে ছয় শতাব্দীরও বেশি সময়ের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সম্পর্ক রয়েছে। ১৪শ শতকে ইরানের হামাদান থেকে আগত সুফি সাধক মীর সাইয়্যিদ আলী হামাদানি কাশ্মীরে ইসলামি সংস্কৃতি, শিল্প ও পারস্য ভাষার প্রভাব বিস্তার করেন। সেই ঐতিহ্য এখনও কাশ্মীরের স্থাপত্য, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে দৃশ্যমান।
ঐতিহাসিক মসজিদগুলোতে ফার্সি স্থাপত্যের প্রভাব দেখা যায়। এই ঐতিহাসিক সম্পর্কের কারণে কাশ্মীরকে একসময় ‘ইরান-এ-সাগির’ বা ছোট ইরান বলা হতো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সহায়তা শুধু আর্থিক নয়, এটি আবেগ ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার প্রতিফলন। মানুষ শুধু বস্তু দান করছে না, বরং তাদের অনুভূতিও ভাগ করে নিচ্ছে।
কোটি কোটি টাকার সহায়তা
স্থানীয় সূত্র মতে, কাশ্মীর থেকে সংগৃহীত সহায়তার পরিমাণ প্রায় ৬০০ কোটি রুপি (প্রায় ৬৪ মিলিয়ন ডলার) ছাড়িয়েছে। এতে নগদ অর্থ, স্বর্ণ, গয়না, গৃহস্থালি সামগ্রী, গবাদিপশু ও যানবাহন অন্তর্ভুক্ত। শ্রীনগর, বুদগাম, বারামুল্লা ও উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় স্থাপিত সংগ্রহকেন্দ্রে স্বেচ্ছাসেবীরা দানের হিসাব রাখছেন। চিকিৎসকরা মেডিকেল কিট তৈরি করছেন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা কার্যক্রম চালাচ্ছে।
নগদ অর্থ দান করছেন কাশ্মীরিরা।
নয়াদিল্লিতে অবস্থিত ইরানের দূতাবাস কাশ্মীরের জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়ে এক বার্তায় তাদের মানবিক সহায়তার প্রশংসা করেছে। দূতাবাসের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমরা কাশ্মীরের দয়ালু জনগণকে তাদের মানবিক সহায়তা এবং আন্তরিক সংহতির মাধ্যমে ইরানের জনগণের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই; এই উদারতা চিরস্থায়ী।’
দূতাবাসের শেয়ার করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক বিধবা তার ২৮ বছর আগে প্রয়াত স্বামীর স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রাখা স্বর্ণ দান করছেন। পরবর্তীতে দূতাবাস সেই পোস্টটি সরিয়ে নিলেও, মিশনটি পরে ভারত ও কাশ্মীরের জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়ে আবার পোস্ট করে। দূতাবাস আরও জানায় যে, ভারত থেকে আসা অনুদানের একটি বড় অংশই কাশ্মীরের অবদান।
Advertisement

নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
তবে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কিছু উদ্বেগও প্রকাশ করেছে। জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ এবং রাজ্য তদন্ত সংস্থা জানিয়েছে, যাচাইবিহীন ব্যক্তিদের মাধ্যমে সংগৃহীত কিছু অর্থ অপব্যবহার হয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী বা সশস্ত্র গোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে পারে।
দান হিসেবে মহিলারা সরঞ্জাম নিয়ে আসছেন।
একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সরাসরি দূতাবাসে অর্থ জমা দিলে উদ্বেগের কারণ নেই, তবে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে সংগ্রহ করা অর্থের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। কর্তৃপক্ষ স্বেচ্ছাসেবীদের দানের রেকর্ড সংরক্ষণ করারও নির্দেশ দিয়েছে, যাতে তহবিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বজায় থাকে। তবে এসব সহায়তা সম্পূর্ণ মানবিক উদ্দেশ্যেই সংগৃহীত হচ্ছে বলে জানিয়েছে আয়োজকরা।
সূত্র: আল জাজিরা

ভারত-শাসিত কাশ্মীরে ইরানকে সাহায্যের জন্য নারীদের দান করা গয়না। ছবি: আল জাজিরা


