ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম,রাজধানীর ঢাকা প্রতিনিধি, শুক্রবার,১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,২৬ ভাদ্র ১৪৩৩২৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮:
চোখের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসেন ৫৫ বছর বয়সি স্কুলশিক্ষিকা রনজীলা পারভীন। ঘটনার দিন ভোরে বগুড়া থেকে বাস যোগাযোগে এসে রাজধানীর গাবতলীতে নামেন তিনি। পরে রিকশাযোগে ফার্মগেট ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হন। কিন্তু হাসপাতাল পর্যন্ত যেতে পারেননি। ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে পথেই প্রাণ হারাতে হয় তাকে। ঘটনা এখানেই শেষ নয়, প্রতিদিনই রাজধানীর প্রধান সড়কসহ অলি-গলিতে ঘটছে এমন ভয়ংকর অপরাধ। এসব ঘটনায় ভুক্তভোগীরা গুরুতর জখম হওয়াসহ মূল্যবান জিনিসপত্র খোয়াচ্ছেন।
-
Advertisement

-
আপনি অপরাধমূলক সংবাদ পাঠাতে পারেন লিখা ও ভিডিও এবং চিত্রসহ প্রধান সম্পাদক মোঃ ইসমাইল হোসেন দ্বায়ী থাকবেন। আপনার নাম ও ঠিকানা এবং মোবাইল নাম্বার গোপন থাকবে। লিখুন আমার ফেইজ বুকে Md Ismail Hossain অথবা ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম।মোবাইল: ০১৭১৪৪৯৭৮৮৫,০১৮০৬৬৭৬৬৬৩
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত শনিবার ভোরে ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ হারানো স্কুলশিক্ষিকার বাড়ি বগুড়ার গাবতলী উপজেলায়। তিনি উপজেলার বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। স্বামীর সঙ্গে চোখের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এসে গাবতলী এলাকায় বাস থেকে নেমে একটি রিকশা নেন। অটোরিকশাযোগে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় পৌঁছার পরপরই মোটরসাইকেলে পেছন থেকে আসা দুই যুবক রিকশারোহী শিক্ষিকার ব্যাগ ধরে টান দেয়। টান দেওয়ার কারণে ওই শিক্ষিকা রিকশা থেকে রাস্তায় ছিটকে পড়েন। পাকা সড়কে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান। পরে তাকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
স্কুলশিক্ষিকা রনজীলা পারভীনই নন, ঢাকার রাজপথে ছিনতাইকারীদের হাতে এভাবে হরহামেশা প্রাণ দিতে হচ্ছে অনেককে। গত দুই বছরে ছিনতাইকারীদের হাতে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছেন।
একই চিত্র রাজধানীর অন্য প্রান্তেও। চলতি বছরের ২৬ জুলাই মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের সামনে ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ হারান ফজলে রাব্বি সুমন নামে ২৫ বছর বয়সি এক যুবক।
এ ছাড়া চলতি বছরের ১ মে আগারগাঁওয়ে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে আহত হন শিল্পী বেগম নামের আরও এক নারী। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালে ভর্তি থাকা অসুস্থ শাশুড়ির চিকিৎসার টাকা নিয়ে রিকশাযোগে যাওয়ার সময় ওই নারীর পথরোধ করে টাকা ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। এ সময় ওই নারীকে ছুরিকাঘাত করে জখম করা হয়।
এর আগে ২০২২ সালের অক্টোবরে ভোরের দিকে হাঁটতে বের হয়ে ধানমন্ডির রবীন্দ্রসরোবরে ছিনতাইকারীদের হাতে খুন হন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার শাহাদত হোসেন। আগের বছর, অর্থাৎ ২০২১ সালে কারওয়ান বাজারের প্রিন্স হোটেলের সামনে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে নিহত হন কেশব চন্দ্র রায়। তিনি সোনারগাঁ ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্সের শিক্ষার্থী ছিলেন।
একইভাবে উত্তরায় একটি ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে টাকা তোলার সময় বুথের ভেতরে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে নিহত হন ব্যবসায়ী শরিফ উল্লা। পল্লবীতে আরমান নামের এক রিকশাচালককে গলা কেটে হত্যার পর তার রিকশাটি নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। কামরাঙ্গীরচরে ছিনতাইকারীরা সাঈদ নামের এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে।
পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, গত দেড় বছরে ছিনতাইয়ের অভিযোগে বিভিন্ন থানায় ৭০৩টি মামলা হয়েছে। এ সময়ে গ্রেপ্তার হয়েছে ১ হাজার ৮৩৭ জন। বছর হিসাবে, ২০২৫ সালে রমনা বিভাগে ৪১টি মামলাসহ গ্রেপ্তার হয়েছে ১৪৪ জন। একইভাবে লালবাগ বিভাগে ২৭ মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে ৫৩ জন। ওয়ারী বিভাগে মামলা হয়েছে ৯৩টি, গ্রেপ্তার ২১৭ জন। মতিঝিল বিভাগে মামলা হয়েছে ১০১টি, গ্রেপ্তার ১৪৪ জন। তেজগাঁও বিভাগে মামলা হয়েছে ১৪৬টি, গ্রেপ্তার ৫১০ জন। মিরপুর বিভাগে মামলা হয়েছে ৫৫টি, গ্রেপ্তার ২১৯ জন। গুলশান বিভাগে মামলা হয়েছে ২৭টি, গ্রেপ্তার ৭৩ জন। উত্তরা বিভাগে মামলা হয়েছে ৪১টি, গ্রেপ্তার ৭৫ জন। সব মিলিয়ে ২০২৫ সালে ৫৩১টি মামলা হয়েছে এবং গ্রেপ্তার হয়েছে ১ হাজার ৪৩৫ জন।
জুনে রমনা বিভাগে মামলা হয়েছে ১৭টি, গ্রেপ্তার ৩৭ জন। লালবাগে মামলা হয়েছে ৫টি, গ্রেপ্তার ৭ জন। ওয়ারী বিভাগে মামলা হয়েছে ৩৮টি, গ্রেপ্তার ৯৮ জন। মতিঝিল বিভাগে মামলা হয়েছে ২৫টি, গ্রেপ্তার ৩৬ জন। তেজগাঁও বিভাগে মামলা হয়েছে ৩৪টি, গ্রেপ্তার ১৩৮ জন। মিরপুর বিভাগে মামলা হয়েছে ১৬টি, গ্রেপ্তার ৪০ জন। গুলশান বিভাগে মামলা হয়েছে ২০টি, গ্রেপ্তার ৩১ জন এবং উত্তরা বিভাগে ১৭টি মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তার ১৫ জন।
পুলিশের গত কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৯ সাল থেকে প্রতিবছরই ছিনতাই বেড়ে চলেছে। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত হওয়া মামলার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ৪৭ হাজারের বেশি অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৯ সালে ছিল ৬ হাজার ৮৮০টি, ২০২০ সালে ৭ হাজার ২০০টি, ২০২১ সালে ৮ হাজার ৪৯৮টি, ২০২২ সালে ৯ হাজার ৫৯১টি, ২০২৩ সালে ৯ হাজার ৪৭৫টি এবং ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৫ হাজার ৮৮৩টি ঘটনা মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকা মেট্রোপলিটন ও রেঞ্জ এলাকায় ১৫ হাজার ৪১৯টি। এরপরই রয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ও রেঞ্জে ৭ হাজার ৭৪৬টি।
তবে অধিকাংশ ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা না নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে। ছিনতাইয়ের শিকার অনেকেই আইনি প্রক্রিয়ায় যান না। সে হিসাবে ছিনতাইয়ের ঘটনার প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।
ডিএমপির ছিনতাই প্রতিরোধে গঠিত টাস্কফোর্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৯ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের অক্টোবরের শুরু পর্যন্ত ২৭৭টি ছিনতাইয়ের মামলায় দুই শতাধিক অপরাধী গ্রেপ্তার হয়েছে। ছিনতাইয়ের সময় হাতেনাতে গ্রেপ্তার হয়েছে ১ হাজার ৮৪১ জন। এ সময়ে জামিন পেয়েছে প্রায় ১ হাজার ৭৮৬ জন। এই এক বছরে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ১১২টি দ্রুত বিচার আইনে মামলা হয়েছে। তথ্যে দেখা গেছে, গ্রেপ্তার আসামিদের বেশির ভাগই জামিনের পরপরই ফের ছিনতাইয়ে জড়িয়েছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ শুরু করে। সরকারের পতনের সময়ে দেশের কয়েকটি কারাগার থেকে দাগি অপরাধীদের একটি বড় অংশ পালিয়ে যায়। আবার অনেকে গোপনে জামিনে বেরিয়ে আসে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জেলপলাতক এবং জামিন পাওয়া আসামিদের মধ্যে একটি বড় অংশ ছিনতাই, চুরি-ডাকাতিসহ বিভিন্ন মামলার আসামি ছিল।
পুলিশ আরও জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মাঠপর্যায়ে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার কারণে ছিনতাইকারীদের তৎপরতা বেড়ে যায়। তবে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত একাধিক গ্রুপের সদস্যদের গ্রেপ্তার করেছে। কিন্তু তাদের অধিকাংশই জামিনে বেরিয়ে একই অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। আবার ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা দায়েরের পর অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু কিছুদিন জেলে থাকার পর চক্রের সদস্যরা জামিনে ছাড়া পেয়ে যান। জামিনে এসে তারা আবার ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ছে।
এ বিষয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, “আসলে পরিসংখ্যান দিয়ে সবকিছু পরিমাপ করা যায় না। তবে এতটুকু নিশ্চিত করে বলা যায়, বিচ্ছিন্ন কিছু অপরাধ সংঘটিত হলেও বর্তমান সরকারের সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পুলিশকে আরও জোরালোভাবে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে কী কী করণীয়, সেসব বিষয়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে হয়তো ছিনতাইয়ের মতো অন্যান্য অপরাধও সহজেই দমন করা সম্ভব হবে।”
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, রাজধানীতে শতাধিক এলাকাকে ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ঢাকায় দীর্ঘদিন ধরে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন, তাদের অনেকের কাছেই নিজ নিজ থানা এলাকার ছিনতাইকারীসহ দাগি অপরাধীদের বিষয়ে তথ্য ছিল। কিন্তু ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে ঢাকায় দীর্ঘদিন কর্মরত থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদের ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে। ঢাকার বাইরে থেকে যেসব কর্মকর্তা ঢাকায় পদায়ন হয়েছেন, তাদের অনেকেই এলাকা সম্পর্কে এখনো পরিচিত হয়ে উঠতে পারেননি।
পুলিশ কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, থানায় ছিনতাইকারী চক্রের যে ডেটাবেজ ছিল, গণঅভ্যুত্থানের সময় অনেক থানায় হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের কারণে তা নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে পেশাদার ছিনতাইকারীদের অনেকেরই ডেটাবেজ না থাকায় চক্রের সদস্যদের চিহ্নিত করা যাচ্ছে না।
অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, ছিনতাই এখন জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকে ছিনতাইয়ের যে মহোৎসব শুরু হয়েছিল, সেটি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। বর্তমান সরকার বা আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও ছিনতাইকারীরা অস্ত্রের মুখে ছিনতাই করেছে।
-
Advertisement

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক জানান, “বর্তমান বাস্তবতায় চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে এখন পেশাদার অপরাধী চক্র সক্রিয়ভাবে যুক্ত হচ্ছে। অনেক অপরাধী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, তাদের হাতে দেশীয় ও প্রাণঘাতী অস্ত্র থাকে এবং একটি বড় অংশ মাদকাসক্ত। ছিনতাইয়ের সময় তারা শুধু সম্পদ লুটেই ক্ষান্ত হয় না, অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকে হত্যা বা গুরুতর আহতও করে। তাই ছিনতাইকারী ও চোর চক্রের হোতা, পৃষ্ঠপোষক এবং সংগঠিত গ্যাংগুলোর নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় শুধু মাঠপর্যায়ের অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।”

প্রতীকী ছবি। এআই দিয়ে তৈরি


