(ভিডিও)ভাইরাল শিক্ষিকা: ক্ষুব্ধ ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে’ গানের গীতিকার আশরাফ বাবু

SHARE

য়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ৪.ম,রাইজিংবিডির সৌজন্যে,মঙ্গলবার   ২৮ জুলাই ২০২৬ ||  শ্রাবণ ১৩ ১৪৩৩ || ১৩ সফর ১৪৪৮ হিজরি :

‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে’ গানে নেচে ভাইরাল সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রাণী পাল। তার নাচের ভিডিও ক্লিপ সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর নেতিবাচক মন্তব্যের শিকার হয়েছেন। চার দশকেরও বেশি সময় আগে প্রকাশিত কালজয়ী এই গান রচনা ও সুর করেন আশরাফ বাবু। গানটির জন্মকথা ও বিউটি পালের বিষয়টি নিয়ে রাইজিংবিডির সঙ্গে কথা বলেছেন বরেণ্য এই গীতিকার। লিখেছেন—জান্নাতুল ফেরদৌস। 

 

 

 

রাইজিংবিডি: ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে’ গানটি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই গান কবে, কখন, কোন প্রেক্ষাপটে রচনা করেছিলেন?
আশরাফ বাবু:
 এটা আসলে দীর্ঘ গল্প। আমি তখনো সেভাবে গান লিখি না বা গান নিয়ে অতকিছু ভাবছি না। ওই টুকটাক লিখতাম। একটা প্যাডে সে সময় কিছু গান লিখে রেখেছিলাম। ১৯৮২ কিংবা ১৯৮৩ সালের দিকের কথা। আমি আবার নতুন কাগজে বা ভালো খাতায় গান লিখতে পারতাম না। চকচকা সাদা পেজ হলে মনে হতো পরীক্ষার খাতা। এ জন্য সিগারেটের প্যাকেট, কাগজের ঢোঙা অর্থাৎ ময়লা কাগজের ওপর ছোট ছোট করে যা মনে আসত, সেই লাইনগুলো লিখে রাখতাম।

 

একদিন আলী আহমেদ বাবু ভাই আমাকে বললেন, তার জন্য ৪টা গান লিখে দিতে হবে। তখন আমি বললাম, আমি তো সেভাবে গান লিখি না, আমার ওই প্যাডটা তাকে দিয়ে দেখতে বললাম। সেখান থেকে ৩টা গান উনার পছন্দ হলো। তখন উনি আমাকে আরো একটি গান লিখে ফেলতে বললেন। এরপর একদিন আমাকে উনার বাসায় ডাকলেন। আমার বাসা থেকে উনার বাসায় যেতে মোটামুটি ৪৫ মিনিট সময় লাগে। আমি হেঁটে রওনা দিলাম, যাওয়ার পথে বৃষ্টি শুরু হলো। তখন মনে হলো—আমি বৃষ্টি নিয়ে কেন গান লিখি না? একটু আলাদা কিছু হবে। যার কারণে বৃষ্টি নিয়ে গানটি লেখা। এই যাত্রাপথে পুরো গানটি লিখেছিলাম।

 

রাইজিংবিডি: গানটির সুর করার গল্প জানতে চাই?
আশরাফ বাবু:
 আগেই বলেছি, আমি কখনো গান লিখি না বা লিখে রাখি না। কোথাও সুর করে রাখি না। তার কারণ আমার ওসব যন্ত্রপাতি ছিল না। আমি বাজাতেও পারতাম না, কিন্তু আমার ব্রেনে যেটা আসত সেটাই আরকি! সেদিনের বৃষ্টির মধ্যে পুরো গানটা লিখে ফেলি। তারপর আলী আহমেদ বাবুর বাসায় গিয়ে রাজনীতি, শ্রাবণের মেঘ, দৃষ্টি প্রদীপ, সরলতা অর্থাৎ সব গান ক্যাসেটে তুলে দিয়ে আসি। তখনো তেমন কোনো বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে গান করি না। টেবিল বাজিয়ে বাজিয়ে গানগুলো তুলে দিয়েছিলাম। ‘শ্রাবণের মেঘ’ গানটি যখন গাই, তখন ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে’ এই জায়গার পর আমার মনে হলো—একটু কোরাস গেলে ভালো লাগবে, একটু আলাদা হবে। দেখবেন যে জিনিসটা একটু আলাদা হয়, সেটা মানুষ বেশি মনে রাখে। এভাবেই গানটি পরে রেকর্ড করা হয়। যতগুলো গান লিখেছি, সেসব গানে উল্টাপাল্টা কোনো কথা নেই। সম্ভবত, ১৯৯১-৯২ সাল। সঠিক মনে পড়ছে না, গানটির অ্যালবাম বের হয়। তখন স্টেজ শো করা শুরু হলো। সেখানে গানটি গাওয়ার পর দর্শকের প্রতিক্রিয়া বেশ গরম ছিল। গানটি তাদের ভালো লাগল। খুলনাতে একটা স্টেজ শো হয়েছিল।

রাইজিংবিডি: এই গানের কোন অংশটা আপনার সবচেয়ে বেশি প্রিয়?
আশরাফ বাবু: 
পুরো গানটাই আমার পছন্দের। তবে সেভাবে বললে—“কবিতার বই সবে খুলেছি/ হিমেল হাওয়ায় মন ভিজেছে/ জানালার পাশে চাপা মাধবী/ বাগান বিলাসী হেনা দুলেছে” এই অংশটা বেশ ভালো লাগে। আমার কিছু ভালো গান আছে। যেমন: ‘বসন্ত ছুঁয়েছে’, ‘এক পশলা বৃষ্টি তোমার জন্য’। পলাশের গান আছে, ব্যান্ডের গান আছে। যেমন: ‘মেলায় যাইরে’ গানের দ্বিতীয় পার্টটা আমার করা।

 

রাইজিংবিডি: গানটি রেকর্ডিংয়ের সময় মজার কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি না?
আশরাফ বাবু:
 ওই যে বললাম, টেবিল বাজিয়ে গানগুলো আমি তুলে দিয়েছিলাম। তারপর যখন অ্যালবাম বের হয়, তখন রেকর্ডিংয়ের সময় আমাকে বলা হয়নি। পরে জানতে পারছি। অবশ্য একটা মজার বিষয় ঘটেছিল, যেটা অনেক পরে জানতে পারি। যখন আমরা ‘অরবিট’ ব্যান্ড শুরু করি, তখনই বাবু ভাই আমাকে বলেছিলেন ঘটনাটি। আমার ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানটি মেজবাহরও পছন্দ হয়। তখন সে বাবু ভাইকে বলে, ‘আপনি ওখান থেকে ২টা গান নেন, আর আমার এখান থেকে ২টা নেন।’ কিন্তু বাবু ভাই কিছুতেই রাজি হননি। এটা নিয়ে তাদের দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। পরে অবশ্য বাবু ভাই ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানটা গেয়েছেন, মেজবাহ আরেকটা গান গেয়েছেন। এই ঘটনা পরে শুনেছি। ১৯৯১/৯২ সালের দিকে মেজবাহ গানটি কাভার করে।

 

রাইজিংবিডি: অ্যালবাম প্রকাশের পর কেমন সাড়া পেয়েছিলেন?
আশরাফ বাবু: 
খুলনাতে আমরা একটা অনুষ্ঠানে গেয়েছিলাম। ওখানে আরেকটা ব্যান্ডও ছিল। আমরা বললাম, ‘আমরা তো নতুন, আমাদের গান কি দর্শকদের পছন্দ হবে?’ তারপর স্টেজে উঠে আলী আহমেদ বাবু ভাই প্রথমেই ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানটা গাইলেন, তখন দেখলাম পরিস্থিতি গরম হয়ে উঠল। দর্শক সারি থেকে আরো গান গাইতে বলল। তখন মনে হলো—না, দর্শক পছন্দ করছেন। তারপরও প্রচুর কনসার্টে এই গান গেয়েছেন।

রাইজিংবিডি: এত বছর পরও এই প্রজন্মের শ্রোতাদেরও গানটি ভীষণ প্রিয়, বিষয়টা কেমন লাগে?
আশরাফ বাবু: 
এটা তো ভালো লাগে। আমি ইউটিউবে দেখেছি অনেকেই এই গান কাভার করছে। তার মধ্যে একজন বৃটিশ অভিনয়শিল্পীও আছেন। তবে আমাকে খুব কম মানুষই চেনে। অ্যালবামটা যখন বের হয়, তখন সবার নাম ছিল বড় অক্ষরে। আমার নাম লিখেছিল—‘আ. বাবু’। অনেকেই আমাকে এই ‘আ. বাবু’ বলে ডাকত। এটাতে আমি বিরক্ত হই। পরে যখন তাদের জিজ্ঞেস করি, আমার নাম এভাবে কেন দেওয়া হয়েছে? তারা আমাকে জানায়, জায়গা কম থাকায় এভাবে লেখা হয়েছে। তাদের বলেছিলাম, ‘আলী আহমেদ বাবু, মেজবাহ রহমান’ নামগুলো ঠিকভাবে দেওয়া গেল আর আমারটা গেল না। এই হলো ঘটনা।

আরেকটা জিনিস হলো—অনেককেই ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানটি ভুলভাবে গাইতে শুনেছি। যেমন: ‘মেঘগুলোর’ জায়গায় ‘মেঘগুলি’ বলে, আবার এক জায়গায় দুইটা ‘থেমে’ শব্দ আছে, সেখানে অনেকেই ‘জমে’ বলে। তারা ভাবে, গানটা তো এমনিতেই হিট, কাভার করলেই হলো। আর ওই যে বললাম, আমাকে খুব কম মানুষ চেনে। গানটা কে লিখেছে, সেটা অতটা হাইলাইট হয় না। এখনো যখন মেজবাহ এই গান গায়, কোথাও আমার নাম বলে না। এটা শুধু আমার ব্যান্ডের দোষ দিব না, সব শিল্পীর মধ্যেই এই জিনিসটা আছে আরকি! গীতিকার সুরকারের নাম বলে না, ৪/৫টা গান গেয়ে দেয়। একবার যদি হিট হয়ে যায়, গানটা কার, গীতিকার কে এসব সামনে আসে না। আমার ক্ষোভ হলো—আমার গান আর আমাকে চিনাবি তো, না কি? আমাকে চিনাস না তোরা!  

 

আর এখনকার কিছু কিছু ছেলেমেয়ের মধ্যে এই ম্যানারগুলো আছে, আর বাদবাকিগুলোর মধ্যে ওই জিনিসটাই নাই। আমি তো বাংলাদেশের সবারই গান করছি, অলমোস্ট যাদেরকে মানুষ চিনে। কিন্তু কেউ নাম বলে না, দুই-একজন ছাড়া। আমি অনেক গান করেছি। ‘সোলস’-এর প্রায় ৮/১০টার উপরে গান করেছি। আজম খানের ৬০টির উপরে গান করেছি (কথা-সুর মিলিয়ে  ৬০টির উপরে)। বাচ্চু ভাইয়ের গান করেছি, জেমসের গান করেছি।

কুমার বিশ্বজিৎ আর পার্থ বড়ুয়া কেন লিরিক্স দেখে গান করে জানেন? লিরিক্সের উপরে লেখা থাকে গানটি কার। এগুলো আবার ইন্ডিয়ানদের মধ্যে আছে। ইন্ডিয়াতে একটা অ্যালবাম চলে একজন গীতিকার-সুরকারের নামের উপরে। এ আর রহমানের নামে সিনেমা চলে, আমাদের এখানে তো ওইটা নাই। আর যারা বিজনেস করত, যেমন: সঙ্গীতা। এরা তো কেউ গানের লোক ছিল না, এরা সব ব্যবসায়ী। এদের পড়াশোনাটাও ওরকম ছিল না।

রাইজিংবিডি: সম্প্রতি ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানটা ব্যবহার করে রিলস বানিয়ে একজন স্কুল শিক্ষিকা ভাইরাল হয়েছেন। অনেকেই সেই শিক্ষিকাকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করছেন। আপনি বিষয়টা কীভাবে দেখছেন?
আশরাফ বাবু:
 আমি এইটার প্রতিবাদ জানাইছি। আজকে দুপুরে জিনিসটা জানতে পারছি। দুপুর থেকে জানতে পারলাম যে, এসব ঘটনাগুলো ঘটতেছে। কিছু বাজে লোক এবং আমার চোখেও পড়ছে এই বাজে লোকদের কমেন্টগুলো। এটা নিয়ে প্রতিবাদও করলাম, ওদের কমেন্টেও আমি রিপ্লাইও দিছি। কারণ তাকে ‘নর্তকী’ বলতেছে। কেউ বলতেছে, এই প্লেসে এটা করা ঠিক হয় নাই। কোন প্লেসে এটা করবে? গাইতে কোনো প্লেস লাগে না কি? তুই তো ব্যাটা…। তুই বলিস যে, স্কুলে কেন, অন্য জায়গায় যাইত। আরে এটাও তো একটা শিক্ষা। এটা অশিক্ষা তো না যে, আমি অশিক্ষার জায়গায় গিয়ে, একটা সেলুনের দোকানে গিয়ে বইস্যা গান করব। হ্যাঁ, করতে পারি আমার মন চাইলে। কিন্তু এটা তো অশিক্ষার জায়গা না। এটাও তো একটা শিক্ষার জায়গা। আর এই গানে তো অশালীন কোনো কথা নাই। বাচ্চাদের একটা ভালো কথা মনের মধ্যে আসতেই পারে, তো তোর এত মাথা ব্যথা কেন? এটা নিয়ে তুই খারাপ কথা বলিস কেন? মেয়ে মানুষ বলে, ছেলে হলে তো বলতি না!

রাইজিংবিডি: সময় দেওয়ার আপনাকে ধন্যবাদ।
আশরাফ বাবু:
 আপনাকেও ধন্যবাদ।

বিউটি পাল, আশরাফ বাবু