
হত্যার শিকার শিশু মুরসালিন শেখছবি: পিবিআই
ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম,বিশেষ প্রতিনিধি, শনিবার ২৭ জুন ২০২৬ || আষাঢ় ১৩ ১৪৩৩ || ১১ মহররম ১৪৪৮ হিজরি :
নদীর তীরে পাওয়া যায় একটি বস্তা। সেটি খুলতেই বেরিয়ে আসে মাথার খুলি, কয়েকটি দাঁত ও হাড়। কে এই মানুষ, কীভাবে মৃত্যু হয়েছে, কেন মরদেহ গোপন করা হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর ছিল না জানা।
-
Advertisement

-
অপরাধমূলক সংবাদ পাঠান
——————————-
আপনি অপরাধমূলক সংবাদ পাঠাতে পারেন লিখা ও ভিডিও এবং চিত্রসহ প্রধান সম্পাদক মোঃ ইসমাইল হোসেন দ্বায়ী থাকবেন। আপনার নাম ও ঠিকানা এবং মোবাইল নাম্বার গোপন থাকবে। লিখুন আমার ফেইজ বুকে Md Ismail Hossain অথবা ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম।মোবাইল: ০১৭১৪৪৯৭৮৮৫,০১৩১৫২৫১১৪৫,০১৮০৬৬৭৬৬৬৩
ঘটনাটি ২০২২ সালের ২৬ ডিসেম্বরের। ঘটনাস্থল ফরিদপুরের মধুখালীর পশ্চিম গোন্দারদিয়া সরদারপাড়া। সেখানে চন্দনা-বারাশিয়া নদীর পূর্ব তীর থেকে থানা-পুলিশ উদ্ধার করে সেসব হাড়গোড়। একটি হত্যা মামলা করে মধুখালী থানা–পুলিশ। তবে নিহত অজ্ঞাতনামা, আসামিও তা–ই।
তদন্ত শুরুর পর থানা–পুলিশ কোনো কূলকিনারা করতে পারছিল না। নানা চেষ্টার পরও উদ্ধার করা যায়নি ভুক্তভোগীর পরিচয়। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে মামলার তদন্তভার যায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে।
একটি নিখোঁজের সাধারণ ডায়েরি (জিডি), একটি ডিএনএ পরীক্ষা ও বাবা–ছেলের ফোনালাপের সূত্র ধরে রহস্যভেদ করে পিবিআই। পরিচয় পাওয়া যায় ভুক্তভোগীর। সেই সঙ্গে অপরাধীরও। পিবিআই জানায়, মরদেহটি ১১ বছরের শিশু মুরসালিন শেখের। মুরসালিনকে হত্যার পর মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়ার স্বীকারোক্তি দেন তাঁর সৎবাবা মিজানুর রহমান। এখন তিনি বিচারের মুখোমুখি।
জিডি থেকে ডিএনএ পরীক্ষা
তদন্তভার পাওয়ার পর পিবিআইয়ের তদন্তকারী কর্মকর্তারা শুরুতে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন। ওই এলাকার নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা খুঁজতে শুরু করেন। এ পর্যায়ে সামনে আসে একটি জিডি।
পিবিআই জানায়, নদী থেকে হাড়গোড় উদ্ধারের মাস ছয়েক আগে ইতি বেগম নামের এক নারী মধুখালী থানায় ওই জিডি করেছিলেন। তাতে বলা হয়েছিল, তাঁর ১১ বছরের ছেলে মুরসালিন শেখকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
একটি নিখোঁজের সাধারণ ডায়েরি (জিডি), একটি ডিএনএ পরীক্ষা ও বাবা-ছেলের ফোনালাপের সূত্র ধরে রহস্যভেদ করে পিবিআই। পরিচয় পাওয়া যায় ভুক্তভোগীর। সেই সঙ্গে অপরাধীরও। পিবিআই জানায়, মরদেহটি ১১ বছরের শিশু মুরসালিন শেখের। মুরসালিনকে হত্যার পর মরদেহ নদীতে ফেলে দেন সৎবাবা মিজানুর রহমান।
এই জিডির বিষয়ে খোঁজখবর নিতে শুরু করেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। কেননা, ঘটনাস্থল থেকে মুরসালিনের বাড়ি বেশ কাছে। এরপর ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ইতি বেগমের নমুনা সংগ্রহ করে পিবিআই। ফল পেতে সময় লাগছিল।
পিবিআই জানায়, এর মধ্যেই মুরসালিনের সৎবাবা মিজানুর রহমান হঠাৎ এলাকা ছেড়ে চলে যান। তিনি স্বজনদের বলে যান, কাজের সন্ধানে বাইরে যাচ্ছেন। কিন্তু তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কাছে বিষয়টি স্বাভাবিক মনে হয়নি। এর মধ্যে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে ডিএনএ প্রতিবেদন পায় পিবিআই। জানা যায়, এটি মুরসালিনেরই কঙ্কাল।

সন্দেহ থেকে স্বীকারোক্তি
মুরসালিন হত্যাকাণ্ডে মিজানুর রহমানকেই প্রধান সন্দেহভাজন মনে করছিলেন তদন্তকারী পিবিআই কর্মকর্তারা। কিন্তু প্রত্যক্ষ কোনো সাক্ষ্য কিংবা দৃশ্যমান কোনো প্রমাণ ছিল না। তাই তাঁকে আটক করাও সম্ভব হচ্ছিল না।
প্রত্যক্ষ কোনো সাক্ষী কিংবা দৃশ্যমান আলামত না থাকলেও পরিস্থিতিগত প্রমাণ, ডিএনএ রিপোর্ট আর আসামির স্বীকারোক্তির সমন্বয়ে হত্যার রহস্য উন্মোচন করা হয়েছে। শিশুটির পরিচয় মুছে ফেলতে চেয়েছিলেন হত্যাকারী। কিন্তু নদীর তীরে পড়ে থাকা হাড় থেকে শেষ পর্যন্ত সেই গোপন সত্য সামনে চলে আসে।
মোস্তফা কামাল, পিবিআইয়ের প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক
ওই পরিস্থিতিতে ভিন্ন কৌশল নেন তদন্তকারীরা। পিবিআই কর্মকর্তারা মিজানুরের মা-বাবাকে জানান, তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মিজানুরই হত্যাকাণ্ডে জড়িত। পালিয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত গ্রেপ্তার এড়ানো সম্ভব হবে না।
এ খবর ঠিকই মিজানুরের কাছে পৌঁছে যাবে, তা থেকেই এই কৌশল। পরে মিজানুরের বাবা এক আত্মীয়ের মুঠোফোন থেকে ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি তদন্তকারীদের বলা কথাগুলো ছেলেকে জানান। দুজনের কথোপকথনের রেকর্ড পিবিআইয়ের হাতে আসে। পিবিআই বলছে, এরপর মিজানুরের জড়িত থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়।
মিজানুরকে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে মাগুরা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন। পিবিআই জানায়, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে যখন তদন্তকারীরা একের পর এক তথ্যপ্রমাণ সামনে আনেন, তখন মিজানুর ভেঙে পড়েন। দোষ স্বীকার করে নেন। পরে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

হত্যার পর মরদেহ গুম
পিবিআইয়ের তদন্তে জানা গেছে, মুরসালিন ছিল ইতি বেগমের প্রথম পক্ষের সন্তান। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয় ইতির। ছেলেকে নিয়ে আলাদা থাকতেন। পরে স্থানীয় শ্রমজীবী মিজানুর রহমানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ২০১৯ সালে তাঁরা বিয়ে করেন। এই সংসারে ইতি বেগমের আরেকটি সন্তান হয়।
সংসারে অভাব-অনটন ছিল, সঙ্গে পারিবারিক কলহও। মিজানুরের প্রথম স্ত্রী তাঁর স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে মেনে নিতে পারেননি। ফলে কলহ তুঙ্গে ওঠে। ২০২২ সালের জুনে পারিবারিক কলহের জেরে ইতি ছোট সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় চলে যান। মুরসালিনকে রেখে আসেন মধুখালীতে নানির কাছে।
মিজানুরকে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে মাগুরা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন। পিবিআই জানায়, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে যখন তদন্তকারীরা একের পর এক তথ্যপ্রমাণ সামনে আনেন, তখন মিজানুর ভেঙে পড়েন। দোষ স্বীকার করে নেন। পরে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন।
ইতি সন্তান নিয়ে কোথায় আছেন, কী করছেন, সেসব মিজানুরকে জানানো হয়নি।
মিজানুর জবানবন্দিতে জানান, ২০২২ সালের ২৫ জুন সকালে মিজানুর মধুখালীর চেয়ারম্যান ঘাটের কাছে মরিচখেতে কাজ করছিলেন। মুরসালিন হেঁটে যাওয়ার সময় মিজানুরের সঙ্গে দেখা হয়। একপর্যায়ে মুরসালিনকে একটি জমির পাশে নিয়ে যান তিনি। ইতির খোঁজ জানতে চান।
পিবিআই বলছে, মুরসালিন জানায়, মায়ের বিষয়ে সে কিছুই জানে না। এ নিয়ে দুজনের রাগারাগি হয়। একপর্যায়ে মুরসালিনের কানে জোরে আঘাত করেন মিজানুর। এতে শিশুটি মাটিতে পড়ে যায়। কান দিয়ে রক্ত বের হতে থাকে। ঘটনাস্থলেই মারা যায় মুরসালিন। হঠাৎ ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েন মিজানুর।

মরদেহ খেত থেকে নদীতে
জবানবন্দিতে মিজানুর জানান, মুরসালিনের মরদেহ শুরুতে একটি ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিলেন তিনি। স্বাভাবিকভাবে কাজ করেন সারা দিন। রাতে ফিরে এসে মরদেহ একটি প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে নিয়ে যান নদীর দিকে। লাশ শনাক্ত করা কঠিন করতে শিশুটির পরনের কাপড় খুলে আলাদা করে ফেলেন। এর পর কয়েক কিলোমিটার হেঁটে গিয়ে বস্তাবন্দী মরদেহটি নদীতে ফেলে দেন।
পিবিআইয়ের তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, মিজানুরের ধারণা ছিল, নদীর স্রোতে ভেসে গেলে হয়তো কোনো দিন মুরসালিনের পরিচয় জানা যাবে না। তবে মরদেহটি ভেসে যায়নি। পঁচে বেশির ভাগ অংশ নষ্ট হয়ে যায়। অবশিষ্ট থাকে হাড়গোড়।
-
Advertisement

এ বিষয়ে পিবিআইয়ের প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, প্রত্যক্ষ কোনো সাক্ষী কিংবা দৃশ্যমান আলামত না থাকলেও পরিস্থিতিগত প্রমাণ, ডিএনএ রিপোর্ট আর আসামির স্বীকারোক্তির সমন্বয়ে হত্যার রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। শিশুটির পরিচয় মুছে ফেলতে চেয়েছিলেন হত্যাকারী। কিন্তু নদীর তীরে পড়ে থাকা হাড় থেকে শেষ পর্যন্ত সেই গোপন সত্য সামনে চলে আসে।



