ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম,আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি, বৃহস্পতিবার ৩০ এপ্রিল ২০২৬ || বৈশাখ ১৭ ১৪৩৩ || ১২ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি :
সমসাময়িক স্থলযুদ্ধগুলোতে সব থেকে কার্যকর অস্ত্রগুলোর মধ্যে যুদ্ধ ট্যাংকের ব্যবহার অন্যতম। যে কোনো পরিস্থিতিতে ও দুর্গম এলাকায় প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতে সব থেকে কার্যকর এই অস্ত্রটি। সর্বশেষ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যাপকভাবে ব্যবহার এই যুদ্ধ ট্যাংক বিশ্বের প্রতিটি দেশের স্থল বাহিনীর জন্য অন্যতম আকর্ষণীয় সমরাস্ত্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এরপর থেকেই পরাশক্তিগুলো এই অস্ত্র আরও বেশি আধুনিকায়নের কাজে মনোনিবেশ করে। আর যেসব দেশের ট্যাংক উৎপাদনের সক্ষমতা নেই, তারা পরাশক্তি দেশগুলো থেকে তা আমদানি করতে নানারকম দেনদরবার চালায়। কিন্তু একটি দেশ এই বাস্তবতার বাইরে গিয়ে নিজেরাই ট্যাংক উৎপাদনের স্বপ্ন দেখে। শেষ পর্যন্ত কারও সাহায্য না পেয়ে সেই দেশটি অর্থাৎ তুরস্ক দীর্ঘ দুই দশকের প্রচেষ্টায় সফলতার মুখ দেখে।
ট্যাংকের মতো ভারী অস্ত্র উৎপাদন সক্ষম হতে হলে দীর্ঘ সময়ের সামরিক গবেষণা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও অর্থনৈতিকভাবে প্রসিদ্ধ হতে হয়, যা তুলনামূলক কম শক্তিশালী দেশগুলোর জন্য এ সক্ষমতা অর্জন বেশ কঠিন। আবার, অস্ত্র বাণিজ্যে পরাশক্তিদের একচ্ছত্র আধিপত্য নতুন কোনো দেশকে ভারী অস্ত্র উৎপাদনে সক্ষম হিসেবে গড়তে দিতে চায় না। এ থেকেই তুরস্কের স্বপ্নকে বাস্তবায়নে কেউ এগিয়ে আসেনি।
বরং নিজস্ব প্রধান যুদ্ধ ট্যাংক তৈরির পথে তুরস্ককে একের পর এক বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। জার্মানির কাছে ইঞ্জিন প্রযুক্তি চেয়েও প্রত্যাখ্যাত হয় দেশটি। একইভাবে পশ্চিমা দেশগুলোও ধারাবাহিকভাবে ‘না’ করে দেয় তাদের। ফলে দীর্ঘ সময় দেশটির হাতে নেয়া প্রকল্প স্থবির হয়ে পড়ে। সব মিলিয়ে প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল পুরো কর্মসূচি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইউরোপের একটি দেশ এগিয়ে আসে। ইউক্রেনের সহায়তায় সেই সংকট কাটিয়ে উঠে তুরস্ক, তৈরি করে তার নিজস্ব ট্যাংক আলটাই। এই প্রকল্পে সময় লেগেছে প্রায় দুই দশক, তৈরি হয়েছে একাধিক প্রোটোটাইপ, আর বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষতির অভিজ্ঞতা থেকেও নিতে হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
তুরস্কের ট্যাংক উন্নয়নের গল্প শুরু হয় শীতল যুদ্ধের সময়- ১৯৫২ সালে, যখন দেশটি ন্যাটোতে যোগ দেয়। ন্যাটোর সদস্য হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র দ্রুতই তুরস্ককে সামরিক সহায়তা দিতে শুরু করে এবং সেই সহায়তার অংশ হিসেবে সরবরাহ করা হয় এম৪৭ প্যাটন ট্যাংক। এটি ছিল তুরস্কের প্রথম আধুনিক ট্যাংক সক্ষমতা, যার মাধ্যমে দেশটি সাঁজোয়া যুদ্ধ কৌশল শেখে এবং আমেরিকান প্রশিক্ষকদের কাছ থেকে ট্যাংক পরিচালনার মৌলিক ধারণা অর্জন করে। সেই সময়টিই তুরস্কের জন্য ভিত্তি তৈরি করে, যা পরবর্তীতে নিজস্ব ট্যাংক তৈরির উচ্চাকাঙ্ক্ষায় রূপ নেয়।
নতুন আবিষ্কার, পুরাতনকে ধরে রাখা
পরবর্তী সময়ে তুরস্ক শুধু বিদেশি ট্যাংকের ওপর নির্ভর করে থাকেনি, বরং সেগুলোকে উন্নত করার দিকেও মনোযোগ দেয়। এম৪৮ প্যাটন ট্যাংকের উন্নত সংস্করণ এম৪৮এ৫টি১’এতে যুক্ত করা হয় ইসরায়েলি ফায়ার কন্ট্রোল সিস্টেম, উন্নত কামান এবং নিজস্ব পরিবর্তন। এরপর এম৪৮এ৫টি২ সংস্করণে যোগ হয় উন্নত থার্মাল ইমেজিং ও সুরক্ষা ব্যবস্থা।
তুরস্কের সামরিক নীতিতে একটি বিষয় স্পষ্ট ছিল- নতুন ট্যাংক না আসা পর্যন্ত পুরোনো কোনো প্ল্যাটফর্ম বাদ দেয়া হবে না; বরং তা উন্নত করে ব্যবহার করা হবে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাওয়া এম৬০এ৩ ট্যাংক যুক্ত হয়ে তুরস্কের সাঁজোয়া শক্তি আরও বেড়ে যায়। একই সময়ে দেশটি বিভিন্ন সীমান্তে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে ছিল- পশ্চিমে গ্রিস, দক্ষিণে সিরিয়া এবং উত্তরে সোভিয়েত ইউনিয়ন। ফলে একাধিক ফ্রন্টে ট্যাংক মোতায়েনের প্রয়োজন পড়ে। সেই চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে যুক্তরাষ্ট্র-তুরস্ক সামরিক সহযোগিতা জোট।
এক সময় তুরস্ক-ইসরায়েল প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদার হলে তুরস্ক তাদের এম৬০টি সাবরা প্রকল্পে ইসরায়েলের সহায়তা নেয়। এই আপগ্রেডের মাধ্যমে পুরোনো এম৬০ ট্যাংককে আধুনিক রূপ দেয়া হয়। যুক্ত করা হয় নতুন টারেট, ১২০ মিমি কামান, উন্নত ফায়ার কন্ট্রোল এবং সুরক্ষা ব্যবস্থা। এই ট্যাংকই লিওপার্ড-২ আসার আগে তুরস্কের সবচেয়ে সক্ষম প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচিত ছিল। যদিও পরবর্তীতে রাজনৈতিক কারণে তুরস্ক-ইসরায়েল সম্পর্কের অবনতি ঘটে, তবুও এই প্রকল্পের প্রযুক্তিগত অবদান থেকে যায়।

এরপর তুরস্ক জার্মানি থেকে লেপার্ড ১ এবং পরবর্তীতে বিপুল সংখ্যক লেপার্ড ২এ৪ ট্যাংক সংগ্রহ করে। বিশেষ করে লেপার্ড ২এ৪ অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে তুরস্ক বিশ্বমানের ট্যাংক সক্ষমতা অর্জন করে। তবে এখানেও তারা থেমে থাকেনি, বরং নিজস্বভাবে ট্যাংক উন্নয়নের দিকে এগোতে চেয়েছিল তারা। এরই অংশ হিসেবে জার্মানির সাহায্য ছাড়ায় লেপার্ড ২-এর জন্য দেশীয় আপগ্রেড প্যাকেজ তৈরি করা হয়, যেখানে উন্নত সুরক্ষা, ডিজিটাল সিস্টেম এবং আধুনিক যুদ্ধ উপযোগী প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়। এসব পদক্ষেপ তুরস্ককে নিজস্ব প্রযুক্তির ট্যাংক সক্ষম হতে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। তারা প্রমাণ করতে চাচ্ছিল বিদেশি প্রযুক্তি ছাড়াও নিজস্বভাবে এর উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম আঙ্কারা।
আলটাই ট্যাংক প্রকল্প
বিভিন্ন দেশ থেকে পাওয়া ট্যাংকগুলো আপগ্রেডের মাধ্যমে পাওয়া আত্মবিশ্বাস থেকেই তুরস্কের আলটাই ট্যাংক প্রকল্প শুরু হয়। ২০১১ সালে প্রথম প্রোটোটাইপ উন্মোচনের মাধ্যমে তুরস্ক জানিয়ে দেয়, তারা নিজস্ব প্রধান যুদ্ধ ট্যাংক তৈরি করতে চায়। কিন্তু প্রকল্পটি সবচেয়ে বড় ধাক্কা খায় ইঞ্জিন সংকটে। ১৫০০ হর্সপাওয়ার ক্ষমতার একটি শক্তিশালী ইঞ্জিন প্রয়োজন ছিল, যার জন্য তুরস্ক জার্মান কোম্পানির প্রযুক্তি চাইলে, তারা তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। শুধু জার্মানিই নয়, অন্যান্য পশ্চিমা দেশও রাজনৈতিক কারণে এই প্রযুক্তি দিতে না করে দেয়। ফলে একটি আধুনিক ট্যাংক প্রস্তুত থাকলেও তা কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় ‘হৃদয়’ অর্থাৎ ইঞ্জিন ছিল না তুরস্কের কাছে।
এই সংকটই প্রায় পুরো প্রকল্পকে ভেঙে দেয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে। তবে শেষ পর্যন্ত অপ্রত্যাশিতভাবে সমাধান আসে ইউক্রেন থেকে। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা শিল্পের তৈরি একটি শক্তিশালী ইঞ্জিন ব্যবহার করে আলটাই প্রকল্প আবারও গতি পায়। প্রায় ২০ বছর পর অবশেষে ট্যাংকটি কার্যকর করার মতো অবস্থায় পৌঁছায়। অবশ্য এর প্রতিদান পায় কিয়েভও। রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে তাদের পাশে উন্নত প্রযুক্তির ড্রোন নিয়ে এগিয়ে আসে আঙ্কারা। ইউক্রেনকে সরবরাহ করে অত্যন্ত কার্যকর বায়রাক্তার টিবি২ যুদ্ধ ড্রোন। এটি ব্যবহার করে রাশিয়াকে বেশ কোণঠাসাও করে ফেলে ইউক্রেন। এর মধ্য দিয়ে তুরস্ক-ইউক্রেন শুধু অস্ত্র আমদানি-রপ্তানি নির্ভর সম্পর্কে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তারা যে কোনো প্রকল্পে সরাসরি একে অপরের কাজে এসেছে।
এদিকে সিরিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে তুরস্কের লিওপার্ড২এ৪ ট্যাংকগুলো বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়, বিশেষ করে নগরযুদ্ধে এবং অ্যান্টি-ট্যাংক ক্ষেপণাস্ত্রের আক্রমণে। এই ক্ষতি তুরস্ককে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। সেই অভিজ্ঞতা সরাসরি আলটাই ট্যাংকের পরবর্তী সংস্করণে প্রয়োগ করা হয়- উন্নত সুরক্ষা, নগরযুদ্ধ সক্ষমতা, অ্যাক্টিভ প্রোটেকশন সিস্টেম ও ডিজাইনে আনা হয় বিভিন্ন পরিবর্তন।
তুর্কি সক্ষমতা
বর্তমানে তুরস্ক শুধু আলটাই ট্যাংকেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং ভবিষ্যৎ সংস্করণেও কাজ করছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন সমন্বয় এবং আধুনিক নেটওয়ার্কভিত্তিক যুদ্ধ প্রযুক্তি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে তারা নিজস্ব পদাতিক যুদ্ধযানও তৈরি করেছে, যা একটি পূর্ণাঙ্গ সাঁজোয়া যুদ্ধব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা করছে।
তুরস্ক সবসময় নিজস্ব প্রযুক্তিতে সমরাস্ত্র তৈরি করতে চায়। এমন পরিকল্পনা থেকে তারা আধুনিক কাপলান ও টুলপার আইএফভিও বানিয়ে ফেলেছে। এসিভি-১৫ এর চেয়েও এগুলো উন্নত এবং নতুন প্রজন্মের সাঁজোয়া যান। তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প বিদেশি নকশা সংযোজন থেকে মৌলিক নকশা তৈরির দিকে পরিপক্ব হচ্ছে। ৭০ বছরে এম৪৭ থেকে কাপলান পর্যন্ত এই যাত্রা দেশটিকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে তারা অস্ত্র অর্জনে আর পরাধীনতার মধ্যে নেয়।
Advertisement

শুধু স্থল যুদ্ধাস্ত্রই নয়, আকাশ পথে আক্রমণ করতে ও আক্রমণ ঠেকাতে নিজস্ব প্রযুক্তির সমরাস্ত্রও বানিয়েছে তুরস্ক। বিশেষ করে পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ ‘কান’ যুদ্ধবিমান, মনুষ্যবিহীন যুদ্ধবিমান বায়রাক্তার কিজিলেলমা এবং অত্যাধুনিক, বহুমুখী ও বহুস্তরযুক্ত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘স্টিল ডোম’ অন্যতম।


