আধিপত্যবাদের নগ্নরূপ: আক্রান্ত ইরান ও সভ্যতার সংকট

SHARE

ছবি: সবার দেশ

য়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ  ২৪.ম,সবার দেশ পত্রিকার সৌজন্যে, রোববার   ০১ মার্চ ২০২৬ ||  ফাল্গুন ১৭ ১৪৩২ || ১১ রমজান ১৪৪৭ হিজরি :

আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ সনদ ও মানবাধিকারের নীতিকে সামনে রেখে নিজেকে এক ‘সভ্যতার অগ্রযাত্রার ধারক’ হিসেবে উপস্থাপন করে আসছে। ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘের ঘোষিত লক্ষ্য ছিলো শক্তির বদলে ন্যায়ের ভিত্তিতে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা, সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান এবং বিশ্বব্যাপি রাষ্ট্রীয় আগ্রাসন রোধ। একইভাবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার প্রধান অভিভাবক হিসেবে কাজ করার কথা।

Advertisement

অপরাধমূলক সংবাদ পাঠান
——————————-
আপনি অপরাধমূলক সংবাদ পাঠাতে পারেন লিখা ও ভিডিও এবং চিত্রসহ প্রধান সম্পাদক মোঃ ইসমাইল হোসেন দ্বায়ী থাকবেন। আপনার নাম ও ঠিকানা এবং মোবাইল নাম্বার গোপন থাকবে। লিখুন আমার ফেইজ বুকে Md Ismail Hossain অথবা ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম।মোবাইল: ০১৭১৪৪৯৭৮৮৫
——————————————

কিন্তু বাস্তবতার আলোকে প্রশ্ন জাগে এ বিশ্বব্যবস্থা কি আদৌ ন্যায় ও নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত, নাকি শক্তির রাজনীতিই এর প্রকৃত নিয়ন্ত্রক? আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তববাদী তত্ত্ব (রিয়েলিজম) বহু আগে থেকেই সতর্ক করে এসেছে যে, রাষ্ট্রসমূহ নীতির চেয়ে স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়; ক্ষমতার ভারসাম্য ও আধিপত্য বিস্তারই তাদের আচরণের চালিকাশক্তি। ফলে আইনের ভাষ্য যতই উচ্চকিত হোক, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রয়োগের ক্ষেত্রে তা প্রায়শই শক্তিধর রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের অনুগত হয়ে পড়ে।

মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা এবং ইরানকে ঘিরে পশ্চিমা শক্তির কৌশলগত আগ্রাসন সে প্রশ্নকে নতুন তীব্রতায় সামনে নিয়ে এসেছে। আঞ্চলিক ভূরাজনীতি, জ্বালানি সম্পদের নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা-আশঙ্কার ভাষ্য এবং গণতন্ত্র রক্ষার বুলি এসবের সমন্বয়ে এমন এক বয়ান নির্মিত হয়েছে, যা বাহ্যত নৈতিকতার দাবিদার হলেও গভীরে অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রাধান্য বিস্তারের নানা কলাকৌশল ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এটি ‘হেজিমনি’ বা আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া, যেখানে প্রভাবশালী শক্তি কেবল সামরিক বলেই নয়, বরং কূটনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং মতাদর্শিক প্রচারণার মাধ্যমে অন্য রাষ্ট্রের নীতি ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। এর ফলে আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্বের নীতিমালা ধীরে ধীরে শক্তিধর রাষ্ট্রের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করা হতে থাকে আর সেখানেই উন্মোচিত হয় আধিপত্যবাদের নগ্নরূপ, যা কেবল একটি দেশের জন্য নয়, গোটা মানবসভ্যতার নৈতিক ভিত্তির জন্যও গভীর সংকটের ইঙ্গিত বহন করে।

বিশ্ব মোড়ল হিসেবে পরিচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সমর্থনে যায়েনবাদী শক্তি দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যকে ইসরায়েলকেন্দ্রিক নিরাপত্তা বলয়ে রূপান্তর করার যে ভূরাজনৈতিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করে আসছে, তার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ইরান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থায় নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের ভাষ্য ব্যবহার করে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো যে ‘নিরাপত্তা স্থাপত্য’ নির্মাণ করেছে, সেখানে ইরানকে ক্রমাগতভাবে একটি ‘হুমকি-রাষ্ট্র’ হিসেবে চিহ্নিত ও উপস্থাপন করা হয়েছে। অথচ আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌমত্বের নীতি এবং জাতিসংঘ সনদের মৌলিক আদর্শ অনুসারে কোনও রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতি বা প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নির্ধারণ তার নিজস্ব অধিকার।

ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সাইবার হামলা, প্রক্সি সংঘাত উসকে দেয়া, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ এবং সরাসরি সামরিক হুমকি এসবই কিছুই বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ নয়। বরং সবকিছুই এক ধারাবাহিক ও সুসংগঠিত আধিপত্যবাদী কৌশলের অংশ। রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘হুমকি নির্মাণ’ (থ্রেট কন্সট্রাকশন) বলা যায় যেখানে একটি রাষ্ট্রকে ধারাবাহিকভাবে বিপজ্জনক প্রতিপক্ষ হিসেবে উপস্থান করে আন্তর্জাতিক জনমতকে প্রভাবিত করা হয়। এর ফলে সে রাষ্ট্রের উপর রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করার যৌক্তিক ও নৈতিক বৈধতা তৈরি করা যায়।

ইরানের উপর পারমাণবিক শক্তি অর্জনের অজুহাতে চাপ প্রয়োগের বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তাররোধের নীতি থাকলেও বাস্তবে তা প্রায়ই দ্বৈতমানদণ্ডের শিকার। একদিকে কিছু রাষ্ট্রের পারমাণবিক সক্ষমতা ‘নিরাপত্তার নিশ্চয়তা’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়, অন্যদিকে অন্য রাষ্ট্রের একই আকাঙ্ক্ষা ‘আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা’ এবং ‘বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা’র  জন্য হুমকি হিসেবে চিত্রিত হয়। এ দ্বৈত মানদণ্ড আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বাস্তবতায় অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হলো আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এমনভাবে পুনর্গঠন করা, যাতে মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম বিশ্বের ওপর ইসরায়েল তার একক সামরিক ও কৌশলগত প্রাধান্য অক্ষুণ্ণ রাখতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শক্তির রাজনীতি (পাওয়ার পলিটিক্স) তত্ত্ব অনুসারে, আধিপত্যবাদী শক্তি কখনোই সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীর উত্থান মেনে নিতে চায় না; বরং প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও বিচ্ছিন্নকরণের মাধ্যমে তাকে দুর্বল করে রাখার চেষ্টা কিংবা তার সক্ষমতা অর্জনের সকল প্রচেষ্টাকে অঙ্কুরে বিনাশের চেষ্টা করে। এ প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের নীতিগুলো কৌশলগত ভাষ্যে রূপান্তরিত হয় আর ন্যায়ের দাবি পরিণত হয় শক্তির প্রয়োগের নৈতিকীকরণে। এখানেই উন্মোচিত হয় আধিপত্যবাদের প্রকৃত রূপ, যা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় আঞ্চলিক সংকটকে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তায় রূপান্তরিত করার ঝুঁকি বহন করে।

উদ্বেগের বিষয়, ‘জোর যার মুল্লুক তার’ এ নীতিই যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনার অঘোষিত ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়, তবে বিশ্ব মোড়ল হিসেবে তার সভ্যতার ধারক ও বাহক হওয়ার নৈতিক দাবি অনিবার্যভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। শক্তির একচ্ছত্র প্রয়োগ কখনোই সভ্যতার সূচক হতে পারে না; বরং তা প্রাচীন সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতার আধুনিক সংস্করণ।

ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রোমান সাম্রাজ্য থেকে ঔপনিবেশিক ইউরোপ যে শক্তিই ‘সভ্যতা বিস্তার’–এর নামে অগ্রসর হয়েছে, শেষ পর্যন্ত তার মুখোশের আড়ালে ক্ষমতা দখল ও সম্পদ লুন্ঠনের প্রকল্পই প্রধান হয়ে উঠেছে।

আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কতত্ত্বে ‘রিয়ালিজম’ শক্তির ভারসাম্য ও স্বার্থকে রাষ্ট্রের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে। এ দৃষ্টিভঙ্গিতে নীতিনৈতিকতা নয়, বরং ক্ষমতার সংরক্ষণই মুখ্য। কিন্তু একই সঙ্গে ‘লিবারালিজম’ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, আইন ও পারস্পরিক নির্ভরতার গুরুত্ব তুলে ধরে; আর ‘কনস্ট্রাকটিভিজম’ দেখায়, রাষ্ট্রের আচরণ কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে নয়, বরং ধারণা, পরিচয় ও মূল্যবোধ দ্বারা গঠিত হয়। এ তাত্ত্বিক বহুত্ব আমাদের শেখায় যে বিশ্বরাজনীতি কেবল শক্তির খেলা নয়; এতে নৈতিকতা, বৈধতা ও বৈশ্বিক সম্মতিরও বিশেষ ভূমিকা আছে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে মনে হচ্ছে শক্তির রাজনীতিই যেন একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করছে, আর নীতি ও নৈতিকতা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে কূটনৈতিক ভাষণ, প্রেস ব্রিফিং ও আনুষ্ঠানিক বিবৃতির অলংকারে। বাস্তবে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা যেনো এক ‘মগের মুল্লুক’।

মার্কসবাদী ইটালীয় চিন্তক, ভাষাতাত্ত্বিক ও সমাজবিজ্ঞানী আন্তোনিও গ্রামশির (১৮৯১-১৯৩৭) ‘হেজিমনি’ ধারণা এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তার মতে, শাসক শক্তি কেবল বলপ্রয়োগে নয়, বরং সম্মতি উৎপাদনের মাধ্যমে আধিপত্য বজায় রাখে। পশ্চাত্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমসহ বৈশ্বিক মিডিয়া-ব্যবস্থার একটি বড় অংশ সেই সম্মতি নির্মাণের কারিগর হিসেবে কাজ করে বলে সমালোচকরা মনে করেন। নির্দিষ্ট ঘটনাকে বিশেষ ভাষ্য ও কাঠামোয় উপস্থাপন, কোন তথ্যকে গুরুত্ব দেয়া হবে আর কোনটি আড়ালে থাকবে এসব কলাকৌশল প্রয়োগের মাধ্যমেই জনমত গঠনের প্রক্রিয়ায় নানাভাবে প্রভাব ফেলে। ফলে আন্তর্জাতিক সংকটের ক্ষেত্রে একটি পূর্বনির্ধারিত নৈতিক অবস্থান তৈরি হয়, যা শক্তিধর রাষ্ট্রের কৌশলগত লক্ষ্যকে ন্যায়সঙ্গত বলে প্রতীয়মান করে।

এ বাস্তবতায় বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা এক গভীর নৈতিক সংকটে উপনীত হয়েছে। যদি আইন ও মূল্যবোধ কেবল দুর্বলদের জন্য প্রযোজ্য হয় আর শক্তিধরদের জন্য ব্যতিক্রম তৈরি হয়, তবে আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা আসলে অনিশ্চয়তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। সভ্যতার প্রকৃত মানদণ্ড শক্তির প্রদর্শনে নয়, বরং ন্যায়ের প্রতি সমান আনুগত্যে প্রতিফলিত হয়, এ সত্য উপেক্ষিত হলে বিশ্বরাজনীতি আবারও আগ্রাসন ও প্রতিশোধের দুষ্টচক্রে আবর্তিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

ইরান জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রতিরক্ষা গবেষণা ও সমরপ্রযুক্তিতে যে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের পথে এগিয়েছে, তা নিছক প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়; বরং চলমান বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে একটি রাজনৈতিক বার্তা যে, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জনই আধিপত্য মোকাবেলার কৌশল। দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ ও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও কোনও রাষ্ট্র যদি নিজস্ব মানবসম্পদ, গবেষণা অবকাঠামো ও কৌশলগত প্রযুক্তি উন্নয়নে সাফল্য দেখায়, তবে তা বিদ্যমান আধিপত্যবাদী কাঠামোর বিরুদ্ধে এক ধরনের বৈপ্লবিক দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নির্ভরতা তত্ত্ব (ডিপেন্ডেন্সি থিওরি) বলছে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো এমনভাবে নির্মিত যে প্রান্তিক রাষ্ট্রগুলো বিশ্বব্যবস্থার কেন্দ্রের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর ওপর নির্ভরশীল থাকবে। সে নির্ভরতার শৃঙ্খল ভাঙার চেষ্টা স্বাভাবিকভাবেই প্রভাবশালী শক্তির অস্বস্তির কারণ হয়। পশ্চিমা শক্তিগুলোর উদ্বেগের পেছনে কেবল সামরিক হিসাব নয়, বরং ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্নও জড়িত।

একটি রাষ্ট্র যখন নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করে, তখন তা কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অর্জন করে অর্থাৎ তার নীতিনির্ধারণে বাইরের চাপ কম কার্যকর হয়। ফলে প্রচার-প্রপাগান্ডা, অর্থনৈতিক অবরোধ, আর্থিক লেনদেনে প্রতিবন্ধকতা এবং কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মাধ্যমে ইরানকে দুর্বল করার দীর্ঘ প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি ‘জোরপূর্বক প্ররোচনা’র (কোরোসিভ পারসুয়েশান) চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত আচরণে বাধ্য করার কৌশল। কিন্তু এসব পদক্ষেপ প্রত্যাশিত ফল না দিলে কৌশল আরও আক্রমণাত্মক রূপ নিতে পারে।

সমালোচকদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল–ঘনিষ্ঠ জোটের অংশীদাররা এখন ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে অস্থিতিশীল বা ক্ষমতাচ্যুত করার সম্ভাব্য পথ খুঁজছে, যাতে রাষ্ট্র হিসেবে ইরানের কৌশলগত সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। ইতিহাসে আমরা দেখেছি, শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রচেষ্টা (রেজিম চেইঞ্জ) প্রায়ই আঞ্চলিক অস্থিরতা, রাষ্ট্রে আভ্যন্তরীণ সংঘাত ও দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে যার মূল্য পরিশোধ করতে হয় দেশটির সাধারণ জনগণকে। ফলে প্রশ্নটি কেবল ইরানের অগ্রগতির জন্য নয়; বরং একটি রাষ্ট্রের আত্মনির্ভরতার অধিকারকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় কতটা স্বীকৃতি দেয়া হবে, সেটিও এখানে মুখ্য হয়ে উঠেছে। যদি আত্মনির্ভরতা ও কৌশলগত সক্ষমতা অর্জনকেই ‘হুমকি’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে তা বৈশ্বিক শৃঙ্খলার ন্যায়সঙ্গত চরিত্র নিয়ে গুরুতর সন্দেহ তৈরি করে এবং আধিপত্যবাদ বনাম সার্বভৌমত্বের সংঘাতকে আরও প্রকট করে তোলে।

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন পুতুল সরকারকে কবজায় রেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাববলয় সেখানে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছে। এটা কোনও নতুন অভিযোগ নয়; পুরাতন ভূরাজনৈতিক কর্মকান্ডের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ। শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে কৌশলগত ঘাঁটি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষার নামে যে সামরিক ও কূটনৈতিক উপস্থিতি এ অঞ্চলসহ বিশ্বের অনেক জায়গায়ই গড়ে তোলা হয়েছে, তা অনেক বিশ্লেষকের চোখে ‘নিরাপত্তা স্থাপত্য’ নয়, বরং আধিপত্যের অবকাঠামো।

এ প্রেক্ষাপটে ইরাক, লিবিয়া বা আফগানিস্তানে শাসক বদলানোর ‘রেজিম চেইঞ্জ’ অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে আলোচিত। এসব দেশে সামরিক শক্তির জোরে শাসক পরিবর্তন করা হলেও টেকসই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি; বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভাঙন, আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাত, জঙ্গিবাদ ও দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা বিস্তার লাভ করেছে। রাজনৈতিক সমাজতত্ত্ব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন আয়োজনের নাম নয়; এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, সামাজিক ব্যবস্থায় আস্থা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশ।

 

বাস্তবতা হলো, বাইরের শক্তির সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত সরকারগুলো প্রায়ই নীতিনির্ধারণে ও কর্মকান্ড পরিচালনায় স্বায়ত্তশাসন হারায় এবং কৌশলগতভাবে পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে বাইরের শক্তির প্ররোচনায়, নির্দেশনায় ও নিয়ন্ত্রণে শাসন কাজ পরিচালনা করে। সমালোচকদের ভাষায়, এতে সার্বভৌম রাষ্ট্রের নেতৃত্ব ‘অনুগত অংশীদার’ থেকে ক্রমে ‘সেবাদাস’ চরিত্রে রূপ নেয়। আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতি অন্য রাষ্ট্রের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা’র অঙ্গিকার এ প্রক্রিয়ায় দুর্বল হয়ে পড়ে। এমন প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে ‘শান্তি’ বা ‘স্থিতিশীলতা’ প্রতিষ্ঠার নামে নতুন কৌশল গ্রহণের কথাও সামনে এসেছে।

সমালোচকেরা অভিযোগ করেন, কিছু উদ্যোগ বাস্তবে শান্তির চেয়ে নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, বিশেষত ইসরায়েলকেন্দ্রিক নিরাপত্তা বলয় বিস্তারের মাধ্যমে যায়েনবাদী স্বপ্ন পূরণে বেশি মনোযোগী। জাতিসংঘের নীতিমালা ও আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামো পাশ কাটিয়ে আঞ্চলিক জোট ও চুক্তির মাধ্যমে ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা সাম্রাজ্যবাদী কৌশলের নতুন সংস্করণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।

ইতিহাস বলছে, বিশেষ কোন রাষ্ট্রজোটের শক্তির বলয়ে আবদ্ধ কৃত্রিম স্থিতিশীলতা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না। যখন একটি রাষ্ট্রের উন্নয়নে পরিকল্পনায় জনগণের অংশগ্রহণ, ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক সাম্য উপেক্ষিত থাকে, তখন বাহ্যিকভাবে প্রতিষ্ঠিত শাসনব্যবস্থা ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে সামরিক আধিপত্য হয়তো স্বল্পমেয়াদে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, কিন্তু তা কোনও অঞ্চলের রাজনৈতিক আত্মনির্ধারণ বা স্থায়ী শান্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে না। বরং এ প্রক্রিয়া সভ্যতার নৈতিক ভিত্তিকেই আরও ক্ষয়িষ্ণু করে তোলে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, সভ্যতার কেন্দ্র কোনও এক জাতি বা রাষ্ট্রের হাতে চিরস্থায়ীভাবে ন্যস্ত থাকে না। প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্য থেকে ঔপনিবেশিক যুগের ব্রিটিশ সাম্রাজ্য, সেখান থেকে সমসাময়িক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, শক্তির কেন্দ্র সময়ের স্রোতে বদলেছে। ইংরেজ ইতিহাসবিদ আর্নল্ড টয়েনবির (১৮৮৯-১৯৭৫) ভাষায়, সভ্যতার উত্থান ও পতন ঘটে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সক্ষমতার ওপর; কোনো শক্তিই অনন্ত নয়। ফলে আজকের আধিপত্যবাদীদের প্রভাববলয় বিস্তারের প্রয়াসও ইতিহাসের নিয়মের বাইরে নয়। ঐতিহাসিক সত্যের এ উপলব্ধি আন্তর্জাতিক রাজনীতির অহংকারকে সংযত করার জন্য যথেষ্ট হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি যায়েনবাদী ও মার্কিন আধিপত্যবাদী শক্তির স্বপ্ন পুরণের অভিলাষ থেকে পরিচালিত আগ্রাসী কর্মকান্ডের জন্য।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ওপর প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘের উদ্দেশ্য ছিলো স্পষ্ট। আর কখনও যেনো শক্তির উন্মত্ততায় কেউ যুদ্ধ বাঁধিয়ে মানবসভ্যতাকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে না দেয়। জাতিসংঘ সনদে সার্বভৌম সমতার নীতি, আগ্রাসন পরিহার এবং বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের কথা ঘোষণা করা হয়। কিন্তু বাস্তবতার আলোচনায় দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানটি প্রতীকী পরিসরে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, বিশেষত যখন শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত স্বার্থ সরাসরি সংশ্লিষ্ট থাকে।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতা সে কাঠামোগত বৈষম্যের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীনের এই বিশেষাধিকার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার শক্তির ভারসাম্যকে বিনষ্ট করে, অপরদিকে তা ন্যায়বিচারের সার্বজনীনতার ধারণাকে সীমিত করে ফেলে। কোনও মুসলিম রাষ্ট্র কিংবা অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশের এ রাষ্ট্রপুঞ্জের সংগঠনের কাঠামোয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতায় সমমর্যাদা নেই। ফলে সিদ্ধান্তগ্রহণ ও বাস্তবায়নে বৈশ্বিক দক্ষিণের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন উঠছে।

আন্তর্জাতিক আইনবিদ ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের পুরোধাদের একাংশ মনে করেন, এ ভেটো কাঠামো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ক্ষমতার ভাগাভাগির দুর্বিসন্ধিমূলক বাস্তবতার ফল; অন্যদিকে রাজনৈতিক সমালোচকেরা একে বৈশ্বিক গণতন্ত্রের পথে প্রধান অন্তরায় হিসেবে দেখেন।

ক্ষমতার এ অসম বণ্টন জাতিসংঘের সাংগঠনিক ও নৈতিক সীমাবদ্ধতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এটিকে একেবারে পরিবর্তন-অযোগ্য বলে ধরে নেয়া ইতিহাসসম্মত নয়; বরং প্রশ্ন হলো, বর্তমানে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো জাতিসংঘের সংস্কার ও কাঠামোগত পুনর্বিন্যাসের রাজনৈতিক সদিচ্ছা আদৌ আছে কিনা কিংবা ভবিষ্যতে তৈরি হবে কি না। যদি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর বাস্তব ক্ষমতার প্রতিফলনমাত্র হয়ে থাকে এবং তারা যদি ন্যায়বিচারের সার্বজনীন আদর্শে উত্তীর্ণ হতে না পারে, তবে আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা ক্রমেই আস্থাহীনতায় নিমজ্জিত হবে। আর সে আস্থাহীনতাই সভ্যতার সংকটকে গভীরতর করে তোলে যেখানে আইন নয়, শক্তিই হয়ে ওঠে শেষ কথা।

বিশ্বের বহু দেশে শাসকদের মাঝে স্বৈরাচারী প্রবণতার উত্থান, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়া এবং আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে ন্যায়ের অবক্ষয় সব মিলিয়ে আমাদের সময় এক গভীর সভ্যতাগত সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। রাজনৈতিক তত্ত্বে বলা হয়, গণতন্ত্র কেবল একটি শাসনব্যবস্থা নয়; এটি এক ধরনের নৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে জবাবদিহিতা, আইনের শাসন ও নাগরিক অংশগ্রহণ পরস্পরকে শক্তিশালী করে। কিন্তু যখন নির্বাচনী প্রক্রিয়া টিকে থাকলেও প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে, বিরোধী মতকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো দ্বৈত মানদণ্ড প্রয়োগ করে, তখন ন্যায়ের ধারণাই বিলুপ্ত হয়।

সভ্যতা কেবল প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ বা সামরিক সক্ষমতার সমার্থক নয়। ইতিহাস আমাদের দেখিয়েছে যে, অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি, অস্ত্রভাণ্ডার ও বৈজ্ঞানিক সাফল্য থাকা সত্ত্বেও কোনও সমাজ যদি ন্যায়বোধ, সহনশীলতা ও পারস্পরিক সম্মান হারায়, তবে তার অগ্রগতি ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। দর্শনের ভাষায়, সভ্যতার ভিত্তি হলো নৈতিক চুক্তির মাধ্যমে এক ধরনের সামাজিক সমঝোতা, যেখানে শক্তির ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণ করে নীতি ও মূল্যবোধ। এ নৈতিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা লাভই উদ্দেশ্যে পরিণত হয়, আর মানবকল্যাণ পেছনে পড়ে যায়; অর্থনৈতিক শোষণ ও রাজনৈতিক নিপীড়নই মুখ্য হয়ে ওঠে।

সমাজমনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ তাই মানুষের মধ্যে ‘নৈতিক অব্যাহতি’ (মোরাল ডিসএন্গেইজমেন্ট) তৈরি করে অর্থাৎ অন্যের কষ্টকে উপেক্ষা করার প্রবণতা জন্ম নেয়। যখন পেশীশক্তি জ্ঞানের ওপর, আর সামরিক আধিপত্য নীতির ওপর প্রাধান্য পায়, তখন সভ্যতা বাহ্যিকভাবে সমৃদ্ধ হলেও ভেতরে ভেতরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। প্রযুক্তির উৎকর্ষ তখন মানবিকতার বিকল্প হয়ে দাঁড়ায় না; বরং তার অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ায়। বর্তমানে সেটাই আমরা প্রত্যক্ষ করছি।

অতএব সভ্যতার প্রকৃত অগ্রযাত্রা নির্ভর করে মানবিক মূল্যবোধের লালন ও বিস্তারের ওপর। ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সম্মান যদি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাষ্ট্রীয় রীতিনীতির কেন্দ্রে স্থান না পায়, তবে উন্নয়নের বাহ্যিক চাকচিক্য টেকসই হবে না। শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতার উল্লাস যতই উচ্চকিত হোক, ক্ষমতার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হলে সভ্যতা সামনে এগোয় না; বরং ইতিহাসের বহু উদাহরণের মতোই একসময় মুখ থুবড়ে পড়ে।

মানবসভ্যতা আজ যেন এক ঐতিহাসিক দ্বৈরথের মুখোমুখি শক্তির প্রয়োগে ক্ষমতার রাজনীতি বনাম সমজোতার মাধ্যমে ন্যায়ের রাজনীতি। একদিকে সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌম সমতা ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার আদর্শ। যদি আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপাক্ষিকতার চর্চা পুনরুজ্জীবিত না হয়, তবে পেশীশক্তির জয়জয়কার আরও বিস্তৃত হবে, আর সভ্যতার সংকট গভীরতর রূপ নেবে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যে বহুপাক্ষিক কাঠামো গড়ে উঠেছিলো বিশেষত জাতিসংঘকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা অনুসরণের মাধ্যমে তার মূল দর্শন ছিল শক্তির উন্মত্ততাকে নীতির শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা এবং আলাপ-আলোচনা ও সমজোতার মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সমস্যাদির সমাধান করা। সে দর্শন দুর্বল হলে বিশ্বব্যবস্থা আবারও প্রতিযোগিতামূলক সামরিকীকরণের দিকে ধাবিত হতে পারে।

আমাদের জন্য ইতিহাসের শিক্ষা সুস্পষ্ট যে, কোনো রাষ্ট্র, জোট বা সাম্রাজ্যের শক্তি চিরন্তন নয়। প্রাচীন সাম্রাজ্য থেকে আধুনিক পরাশক্তি সবাই সময়ের পরীক্ষায় পরিবর্তিত ও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। শক্তির কেন্দ্র স্থানান্তরিত হয়েছে, কিন্তু ন্যায় ও মানবিকতার প্রশ্ন অম্লান থেকেছে।

Advertisement

প্রতিটি উপজেলায় সংবাদদাতা আবশ্যক। যোগাযোগ ০১৭১৪৪৯৭৮৮৫

রাজনৈতিক দর্শনের আলোচনায় মার্কিন চিন্তক জন রলসের (১৯২১-২০০২) ‘ন্যায়ভিত্তিক সমাজ’ ধারণা কিংবা জার্মান চিন্তক ইমানুয়েল কান্টের (১৭২৪-১৮০৪) ‘চিরস্থায়ী শান্তি’র স্বপ্ন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় টেকসই শান্তি কেবল সামরিক ভারসাম্যে নয়, বরং ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। অতএব ন্যায়ভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার দায় কোনও একক রাষ্ট্রের নয়; এটি সমগ্র মানবজাতির নৈতিক দায়িত্ব।

নাগরিক সমাজ, বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রসমূহ সবার সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এ অবক্ষয়িত বিশ্বব্যবস্থার পুনর্গঠন সম্ভব নয়। অন্যথায় শক্তির উন্মত্ততা ও প্রতিশোধের চক্র মানবসভ্যতাকে এমন এক অন্ধকার যুগে ঠেলে দিতে পারে, যেখানে নীতি-নৈতিকতা ইতিহাসের পাতায় বন্দী স্মারকে পরিণত হবে। সভ্যতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে বিশ্ব নাগরিক হিসেবে আমরা কোন পথকে অনুসরণ করছি- ভয় ও আধিপত্যের, নাকি ন্যায় ও সহমর্মিতার।

লেখক:
ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।