(ভিডিও)গণভোটে ‘হ্যাঁ’: সংস্কারের জন্য, নাকি নিরাপদ বিদায়ের সিঁড়ি?

SHARE

য়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ  ২৪.ম,বিশেষ প্রতিনিধি, শুক্রবার   ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  ফাল্গুন ১৪ ১৪৩২ || ৯ রমজান ১৪৪৭ হিজরি :

সংস্কারের যে ভঙ্গুর বন্দোবস্ত সামনে আনা হয়েছে, গণভোটে তার জয়ের ওপর কি সরকারের নিরাপদ নিষ্ক্রমণ নির্ভর করছে?

৫ অগাস্ট ২০২৪, ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের ফলে প্রথমে কেউ কেউ ভেবেছিলেন যে ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ বা ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ অর্জিত হয়েছে। উচ্ছ্বাসে ভরপুর গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীরা ভেবেছিলেন যে ক্ষমতা হাতের মুঠোয় এসে গেছে; পরে তারা অবশ্য স্বীকার করেছেন যে ‘বিপ্লব বেহাত হয়ে গেছে’। কিন্তু সেটাও ঠিক নয়। বিপ্লব আসলে হয়ইনি; কেউ কেউ ভুল করে আশা করতে পারেন যে গণ-অভ্যুত্থান অনিবার্যভাবে বিপ্লবে পরিণত হবে। ছাত্রদের সাহস ও আত্মত্যাগ দেখে মনে হতে পারে যে একটা বিপ্লব হতে যাচ্ছে, কিন্তু আসলে সেটা ছিল নিছক ‘রেজিম চেঞ্জ’। তাও সেটা হয়েছিল সাংবিধানিক বিধান মেনে প্রাক্তন সরকারের রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতায় রেখে এবং শাসনতন্ত্র রক্ষা করেই; তৎকালীন অগ্রণী তরুণদের বিচারে দেশে-বিদেশে একজন ‘সর্বজন গ্রহণযোগ্য’ ব্যক্তিকে ক্ষমতাসীন করার মাধ্যমে। তিনি ছিলেন বিদেশে চিকিৎসাধীন। সেখান থেকে তরুণদের অনুরোধে তিনি ক্ষমতা নিয়েছিলেন বলে তখন জানিয়েছিলেন। পরে তিনি স্বীকার করেছিলেন যে, এর পেছনে তার এক তরুণ সঙ্গীর এক দীর্ঘমেয়াদী ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ ছিল।

Advertisement

অপরাধমূলক সংবাদ পাঠান
——————————-
আপনি অপরাধমূলক সংবাদ পাঠাতে পারেন লিখা ও ভিডিও এবং চিত্রসহ প্রধান সম্পাদক মোঃ ইসমাইল হোসেন দ্বায়ী থাকবেন। আপনার নাম ও ঠিকানা এবং মোবাইল নাম্বার গোপন থাকবে। লিখুন আমার ফেইজ বুকে Md Ismail Hossain অথবা ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম।মোবাইল: ০১৭১৪৪৯৭৮৮৫
——————————————

তরুণ সেই ডিজাইনারের পরবর্তীতে প্রকাশিত বিভিন্ন ভাষ্য মতে, প্রয়োজনীয় কিছু গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যবিরোধী সংস্কার শেষে একটি অবাধ, ভয়-ভীতি, লোভ-ঘুষ ও প্রশাসনিক কারসাজিমুক্ত এবং ব্যাপক ভোটারের অংশগ্রহণমূলক শান্তিপূর্ণ উৎসবমুখর নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারই ছিল তাদের বিচারে মুখ্য কাজ। তবে তাদের পাশাপাশি আওয়ামী স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ধর্মীয় ফ্যাসিস্ট রাজনৈতিক শক্তিগুলোও অংশগ্রহণ করেছিল। শেখ হাসিনা ভারতে চলে যাওয়ার পরপরই তাদের অনেক গোপন মনোবাসনার কথা জামায়াত ও তাদের সঙ্গীরা ধীরে ধীরে প্রকাশ করেছে। শুরুতে সম্ভবত ধারণা করা হয়েছিল যে, সকলের দাবি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংস্কার সমাপ্ত করতে সর্বোচ্চ ৩ বছর সময় লাগবে। তবে বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের বাম ও বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দলগুলোর চাপে এবং সেনাপ্রধানের কথা অনুসারে দেড় বছরের মধ্যেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে হয়তো যে কোনো প্রকারে একটি নির্বাচন দিয়ে নিরাপদে বিদায় নিতে হতে পারে। সেটি যে একটি আদর্শ নির্বাচন না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, সেই আশঙ্কা ইতোমধ্যে অনেকেই প্রকাশ করেছেন। আর পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে যে, মূল ডিজাইনার বলে যাকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস স্বীকৃতি দিয়েছিলেন, তিনি নিজে পদত্যাগ করে জানিয়েছেন যে তার পক্ষে ডিজাইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংস্কার করা আদৌ সম্ভব হয়নি।

বিপ্লব না ক্ষমতার পটপরিবর্তন?

গণ-অভ্যুত্থানের প্রাথমিক পর্বের আশাবাদের পর ধাতস্থ হয়ে গণ-অভ্যুত্থানে আশা নিয়ে অংশগ্রহণকারী অনেকেই বলেছিলেন যে, এই অভ্যুত্থানের প্রাথমিক সম্ভাবনা অনেক উজ্জ্বল মনে হলেও পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থাটি খুবই তরল ও অনিশ্চিত। এর ফলাফল খুব খারাপও হতে পারে, আবার ভালোও হতে পারে। নির্ভর করবে অভ্যুত্থান পরবর্তীকালে জনগণ ও বিপ্লবী ছাত্ররা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ঠিক পথে রাখতে পারবে কি পারবে না তার ওপর।

ইতোমধ্যে ক্রমশ এটা পরিষ্কার হয়েছে যে, ইউনূস সরকার বিপ্লব নয়, শাসক শ্রেণির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব মেটানোর জন্যই সেনা, দেশীয় দক্ষিণপন্থী শক্তি ও বিদেশী শক্তির (সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমা শক্তি ও তাদের অনুগত দেশীয় শক্তি এবং আন্তর্জাতিক অর্থনির্ভর এনজিও/প্রতিষ্ঠানসমূহ) সমর্থনে গঠিত একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ইতিহাস দেখলে প্রমাণ করা যাবে যে, আওয়ামী লীগ ছাড়া বর্তমান শাসক শ্রেণির অন্য সবগুলো প্রধান রাজনৈতিক দলের সমর্থন এবং প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সমর্থন নিয়েই ড. ইউনূস ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। শুধু তরুণ-কিশোরদের ওপর নির্ভর করে বা বামপন্থীদের অনুমোদনে তার ক্ষমতায় বসা হয়নি। আমরা এও জানি, আওয়ামী লীগ ছাড়া শাসক শ্রেণিরই নানা সময়ে নানা অংশ বা প্রাক্তন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলো হচ্ছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলাম এবং জাতীয় পার্টি। এছাড়া তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখন পর্যন্ত নিজেকে মধ্যপন্থী নতুন দল হিসেবে দাবি করলেও তার ভেতরে প্রচুর পরস্পরবিরোধী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে (বাম, ডান, মধ্য ও ইসলামী—সকলকে ধারণ করা একটি জগাখিচুড়ি দল!) এবং দল হিসেবে সুস্পষ্ট কোনো আদর্শ ধারণ করে তারা এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। উপরন্তু তারা এখনো আদর্শগত নানা ভাঙা-গড়া ও অস্থিরতার মধ্যে আছে। তবে এই সামান্য সময়ে তারা বর্তমান সরকারে ছিল, তাতে তাদের অনেকের ভাবমূর্তিও কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এযাবৎ ছাত্ররা কখনো গণ-অভ্যুত্থানের পর নিজেরা সরকারের মন্ত্রী হননি!

তবে উল্লিখিত সকল রাজনৈতিক শক্তির কম-বেশি সমর্থন নিয়েই ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারই এখন পর্যন্ত দেশ চালাচ্ছে বলে দেখা যায়। এখন তাদের সামনে প্রধান প্রশ্ন বাঘের খাদ্য না হয়ে বাঘের পিঠ থেকে নামার ব্যবস্থা করা।

তবে ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসীরা এ বিষয়ে বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্রকারী ও মৌলবাদীদের দিকে বিশেষ অঙ্গুলি নির্দেশ করে আসছেন। তাদের মতে ইউক্রেইন, জর্জিয়া ও আরব বসন্ত পরবর্তী শাসন ক্ষমতা পরিবর্তনের মতো বাংলাদেশের এটিও ছিল একটি ‘রঙিন বিপ্লব’ (Colour Revolution); যার পেছনে সাধারণত থাকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ‘ডিপ স্টেট’-এর পুঙ্খানুপুঙ্খ গোপন নকশা এবং ‘মানবাধিকার ও টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স’-এর নামে নানা আর্থিক বিনিয়োগ ইত্যাদি। পোস্ট ট্রুথ সোসাইটিতে নিওলিবারেল বয়ান ও ধর্মীয় বয়ানের মিশ্রিত নানা পপুলিস্ট প্রচার-অপপ্রচার দ্বারা এ ধরনের রেজিম চেঞ্জ সংঘটিত হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই হাইপোথিসিসের সবটা এখনো প্রমাণ করা না গেলেও আংশিক প্রমাণযোগ্য টুকরো টুকরো ঘটনা (Fragmented facts) যোগ করলে একটি নকশা বা প্যাটার্নের সাক্ষাৎ পাওয়া কঠিন হবে না। সেই অনুযায়ী এর চূড়ান্ত ফলাফল হওয়ার কথা এক দক্ষিণপন্থীকে সরিয়ে আরেক দক্ষিণপন্থী বা আরও দক্ষিণ অভিমুখী প্রো-আমেরিকান সরকার প্রতিষ্ঠা।

ইউনূস সরকারের স্বরূপ: কার সমর্থনে এই যাত্রা?

আসল প্রশ্নটা হচ্ছে জনগণের মধ্যে গণতান্ত্রিক দেশপ্রেমিক শক্তিগুলো (আমি ‘গণতান্ত্রিক-দেশপ্রেমিক’ শক্তি বলতে বোঝাচ্ছি তাদের, যারা কমপক্ষে স্বৈরাচারী শাসন নতুন রূপে প্রত্যাবর্তন দৃঢ়ভাবে আটকাতে চান, বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী শক্তির প্রভুত্বেরও ধাপে ধাপে অবসান চান এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িক বিভক্তির সম্পূর্ণ অবসান চান—এই ত্রয়ী নীতির পক্ষের লোকদের বোঝাচ্ছি)। প্রগতিশীল দলগুলো দুর্বল হলেও তারা অবশ্য সর্বদা এই নীতিগুলোর পক্ষেই অবস্থান নিয়ে এসেছে। এছাড়া আশা নিয়ে গণ-অভ্যুত্থানে অন্য যারা অংশগ্রহণ বা নীরবে তা সমর্থন করেছিলেন, তারা এখন কীভাবে তাদের সেসব আশা সহ উল্লিখিত সাধারণ শত্রুদের প্রতিরোধ করে তাদের ন্যূনতম গণতন্ত্রের আশা ও শোষণ, নির্যাতন-বৈষম্য নিরসনের নানা আকাঙ্ক্ষা পূরণ করবেন—সেটাই হচ্ছে জনগণের জন্য প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু। যদিও গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি হতাশা এবং এমনকি তাদের মধ্যে বর্তমানে এমন একটি আশঙ্কা রয়েছে যে, তবে কি এত আত্মত্যাগ বৃথা যাবে? কিন্তু তারপরেও দেশের নাগরিকদের বলতে হবে, বিপ্লব বেহাত হয়ে গেছে বলে হাল ছেড়ে দেওয়াটা মোটেও ঠিক হবে না। বর্তমানে ক্ষতি বা বিশ্বাসের বিচ্যুতি যা হওয়ার হয়ে গেছে ধরে নিয়ে ‘ড্যামেজ’ কমানোর জন্য মাঠে নামতে হবে।

পরীক্ষিত ধনিক শ্রেণির শাসক দলগুলোর বাইরের দেশপ্রেমিক-গণতান্ত্রিক শক্তির মধ্যে প্রগতিশীল সুনির্দিষ্ট অংশটি গণ-অভ্যুত্থানের আগেই মাঠে-ঘাটে যে স্লোগানটি দিত তা হচ্ছে, ‘দুঃশাসন হঠাও-ব্যবস্থা বদলাও—বাম গণতান্ত্রিক বিকল্প তৈরি করো’। প্রগতিশীলদের এই দাবি মহৎ হলেও তা এখন পর্যন্ত কার্যকরী করার কোনো দৃশ্যমান শক্তি তারা তৈরি করতে পারেনি। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীসহ গণ-অভ্যুত্থানের অন্যান্য বড় শক্তিগুলো এত বড় উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা না বললেও, তারাও চেয়েছিল তাদের পছন্দমতো কিছু নিজস্ব আদর্শ ও ঐকমত্যভিত্তিক সংস্কার এবং একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক নির্বাচন। ড. ইউনূস ও ড. আলী রীয়াজের ঘোষিত লক্ষ্যও ছিল তাদেরই মতো। তারাও বিপ্লব নয়, সীমিত ইতিবাচক সংস্কারই চেয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সীমিত সংস্কার নিয়েও জাতীয় ঐকমত্য হয়নি। আসলে বাস্তব ঐতিহাসিক কারণে তা সম্ভবও ছিল না। কারণ বড় রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মতাদর্শ এক ছিল না। বিশেষত ইসলাম ও শরিয়াহভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা যারা চান, তাদের চাওয়ার সঙ্গে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন যারা দেখেন তাদের বৈরিতামূলক দ্বন্দ্ব থাকাটাই স্বাভাবিক। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো চায় ‘ইহলৌকিক’ বিষয়ে নিজ নিজ প্রাচীন ধর্মীয় প্রেসক্রিপশন আক্ষরিকভাবে চালু করতে। ফলে কোনো দেশে যদি একাধিক ধর্মের অনুসারী বা ধর্মবিশ্বাস-বহির্ভূত নাগরিক থাকে এবং তাদের যদি নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থ ভিত্তিক আক্ষরিক আইনের সুপারিশ থাকে, তবে শরিয়াহ আইনের সঙ্গে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান আইনের একটি অমীমাংসাযোগ্য দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে।

গণভোটের প্রচারে নির্বাচন কমিশনের ফটোকার্ড।

গণভোটের প্রচারে নির্বাচন কমিশনের ফটোকার্ড।

তবে কেউ কেউ বলেন যে, ‘ভোটের বাজারে বা রাজনীতি বা আদর্শের বাজারে নানা রকম সুবিধাজনক ব্যাখ্যা কেনা-বেচা যেহেতু চলে, তাই শাসক শ্রেণির রাজনীতিতে এসব মতভেদ বা দ্বন্দ্ব নিয়ে শেষ কথা বলে কিছু নেই।’ এখানে নির্বাচন পরবর্তী সরকার গঠনে সে ধরনের একটি ভঙ্গুর বা অস্থায়ী বন্দোবস্ত (Deal) হলেও হতে পারে। ড. ইউনূস ও আলী রিয়াজের দীর্ঘদিন সাধনার পর যোগ-বিয়োগ করে যে প্যাকেজ সনদটি প্রণীত হয়ে গণভোটের জন্য দেওয়া হয়েছে, সেটি সে ধরনেরই একটি দুর্বল ও ভঙ্গুর বন্দোবস্তের পরিকল্পনা বলেই প্রতিভাত হয়। কারণ এতে একাধিক প্রশ্ন রয়েছে যার কোনো কোনটি সবাই সহজেই মানবেন যেমন, ‘সংস্কার আপনি চান কি চান না?’ সবাই এতে ‘হ্যাঁ’ ভোটই দেবেন বলে ধারণা করা যায়। কিন্তু যখন সংবিধানের বিশেষ বিশেষ সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া হবে, তখন সংবিধানসম্মতভাবে সংস্কার করতে হলে এতে সংসদ থেকে অনুমোদনের ব্যাপারটি অনিবার্যভাবে সামনে এসে যাবে। তখন আসলে শুধু গণভোট দিয়ে সমাধান করা যাবে না—অতীতের মতো সংসদই সেই সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো পাস করিয়ে তার মীমাংসা করতে হবে। সেজন্যই কোনো কোনো দল মনে করে যে গণভোট একটি অপ্রয়োজনীয় বিষয় এবং সংসদই এখানে সার্বভৌম নির্ধারক শক্তি। তবে ড. ইউনূস ও তার বন্ধুদের নিরাপদ নিষ্ক্রমণের (Safe Exit) সহায়ক হবে যদি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়। সেজন্যই সম্ভবত ইউনূস সরকার নিরপেক্ষ সরকার হিসেবে নিজেকে দাবি করলেও গণভোটে হ্যাঁ-কে জয়ী করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে।

চূড়ান্ত বিচারে, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য সংসদীয় নির্বাচন এবং নির্বাচনের ফলাফলের ওপরই গণভোট, সরকার গঠন ও সংস্কারসমূহের পরিণতি নির্ভর করবে। সম্ভবত সে কথা মনে রেখেই বিএনপিও বর্তমানে সনদের ক্ষেত্রে ‘ভিন্নমত’ দেওয়া সত্ত্বেও পরবর্তীতে আপস প্রস্তাবানুসারে তাতে স্বাক্ষর করেছে; কিন্তু একই সঙ্গে আবার সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নির্বাচন একই দিনে করার জন্য অনড় ছিল। একথা ঠিক, ‘সংস্কার’ চাই কি চাই না—শুধু এই প্রশ্ন নিয়ে ভোট হলে গণভোটে জয়লাভ করা যত সহজ ছিল, এখন প্যাকেজ-ডিলে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়যুক্ত করাটা ততোধিক কঠিন হবে। কারণ অনেকগুলো সংস্কার প্রস্তাব আছে যা সংবিধানকে স্পর্শ করে এবং তা নিয়ে প্রধান দলগুলোর মধ্যেই দ্বিমত রয়েছে। তদুপরি গণভোটের নিয়ম হচ্ছে ‘পুরোটা গ্রহণ করো নতুবা কোনোটাই না’। অনেকেই এ ধরনের ‘Either-Or-choice’–এ অস্বস্তি বোধ করতে পারেন এবং গণভোটে শেষ পর্যন্ত অংশগ্রহণ থেকেই বিরত থাকতে পারেন। ইতোমধ্যে বামপন্থীরা জানিয়েছেন যে গণভোট অপ্রয়োজনীয়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলের সাধারণ ভোটাররাও এ ব্যাপারে অনিশ্চিত বা নেতিবাচক থাকবে বলেই মনে হচ্ছে। তাহলে ইউনূস সরকারকে বাধ্য হয়ে নির্ভর করতে হচ্ছে জামায়াত ও এনসিপির ওপর। এটা দিয়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-কে জয়ী করা যাবে কি? সুতরাং ১২ ফেব্রুয়ারির দুটি ভোট নিয়েই এক ধরনের তরল অবস্থা বিরাজ করছে।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের ফটোকার্ড।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের ফটোকার্ড।

গণ-অভ্যুত্থানের পূর্বে সবাই শেখ হাসিনাকে সরানোর ব্যাপারে প্রথমে ঐকমত্য পোষণ করলেও এবং ড. ইউনূসকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিচালনার দায়িত্ব দিতে রাজি হলেও, শেখ হাসিনা চলে গেলে ক্ষমতায় কে বসবে সেই প্রশ্নে কিন্তু কখনো কোনো ঐকমত্য তৈরি হয়নি। গণ-অভ্যুত্থানের শেষ পর্যায়ে সকলের একটা প্রিয় নেগেটিভ স্লোগান ছিল, ‘এক দফা-এক দাবি, শেখ হাসিনা কবে যাবি’। কিন্তু যখন শেখ হাসিনা ক্ষমতা থেকে অপসারিত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেন, তারপর থেকে ওই শূন্য স্থানে কে বসবে সেই পজিটিভ বিষয়ের ওপর দেশী-বিদেশী শক্তি ও দেশের ভেতরের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নানা দ্বন্দ্ব ও মেরুকরণ শুরু হয়ে গিয়েছিল এবং সেটাই ছিল অনিবার্য পরিণতি। এখন তারেক রহমানকে সেখানে শাসক শ্রেণির দলগুলো সামনে আনছে। কিন্তু সবাই কি তা মানছে? অন্তত জামায়াত তো নয়ই! নাকি বাইরে এক—ভেতরে আরেক?

সংস্কার প্যাকেজ ও গণভোট: ঐকমত্যের সংকট

এখন আর জামায়াত, অন্যান্য ইসলামী দল, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, এনসিপি, আওয়ামী লীগ, বামপন্থীরা কেউই আর জাতীয়ভাবে এক কাতারে ঐক্যবদ্ধ নেই। স্বাভাবিকভাবেই নিজের দলকে কেন্দ্র করে ভোটে জেতার জন্য অথবা তলে তলে ভোট ঠেকানোর জন্য তারা কেউ কেউ গড়ে তুলছে সুবিধাজনক কৌশলগত মৈত্রীজোট। এই পটভূমিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এবং বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে ১৬ বছর পর বহুপ্রতীক্ষিত ভোটের গণতন্ত্র। এই নির্বাচনে কোন ধরনের মিত্রদের জোট বা যুক্তফ্রন্ট গঠন করে দেশপ্রেমিক-বাম-গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্য এবং ব্যবস্থা বদলের সংগ্রামকে প্রগতিশীলরা কীভাবে এগিয়ে নিতে পারবে, এটি যেমন প্রগতিশীলদের সামনে মুখ্য প্রশ্ন; তেমনি দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপির সামনে রয়েছে তাদের ৩১ দফা মতাদর্শভিত্তিক নিজস্ব বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ নিয়ে এগোনোর প্রশ্ন। অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপি চায় মুক্তিযুদ্ধের সংবিধান বিরোধী সংস্কারের সনদ নিয়ে এগোতে। এই সনদে চার মূলনীতি থেকে তিন মূলনীতি—বিশেষ করে ‘জাতীয়তাবাদ’, ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বাদ রাখা হয়েছে। যদিও এগুলোর বদলে সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার মতো অপেক্ষাকৃত গ্রহণযোগ্য বিমূর্ত শব্দগুলো আবার আমদানি করা হয়েছে। যেজন্য বামরা কেউ কেউ এইটুকু গ্রহণ করে সন্তুষ্ট রয়েছেন, তবে প্রধান বামেরা সনদ শেষপর্যন্ত স্বাক্ষর করেননি। তবে আলী রিয়াজ কমিটির সংস্কার প্যাকেজ নিয়ে জামায়াত ও এনসিপি মোটামুটি একমত হয়েছে এবং তারা উভয়ে জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের মাধ্যমে এগুলো পাস করিয়ে নিতে চেয়েছিল। আগেই বলেছি, বিএনপি প্রথমে চেয়েছিল জাতীয় নির্বাচন আগে হোক; এখন শেষ পর্যন্ত শর্তসাপেক্ষে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একসঙ্গে হওয়াটা মেনে নিয়েছে। তবে নির্বাচনে জিতলে তারা এই সংস্কার প্যাকেজ নিয়ে কী বলবে বা করবে তা সংসদে বসে তারা পরবর্তীতে ঠিক করবে। সুতরাং এত কষ্ট করে যে সনদ তৈরি হলো, তার ভবিষ্যৎ এখন বস্তুত শূন্যে ঝুলছে!

Advertisement

প্রতিটি উপজেলায় সংবাদদাতা আবশ্যক। যোগাযোগ ০১৭১৪৪৯৭৮৮৫

ফ্রন্ট, ফর্ম ও ভবিষ্যৎ: করণীয় কী?

অতীতে অনেক বড় বড় সামষ্টিক গণতান্ত্রিক সংগ্রামে এদেশের জনগণকে কখনো যুক্তফ্রন্ট করে, কখনো ইস্যুভিত্তিক ফ্রন্ট করে, বা কনভেনশন/প্ল্যাটফর্ম করে ঐক্যবদ্ধ করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। কখনো ফ্রন্ট ছাড়া এক ধরণের যুগপৎ, সম-অভিমুখী বা সমান্তরাল আন্দোলন করে অথবা এমনকি বিশেষ বিশেষ উপলক্ষে মিত্রদেরকে এক প্ল্যাটফর্মে ডেকে এনে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রামের সূচনা ও নানা আয়োজন বা পদক্ষেপ নিয়ে রাজনৈতিকভাবে এবং অরাজনৈতিক গণসংগঠনের মাধ্যমে জনগণের সংগ্রামকে অগ্রসর হতে আমরা দেখেছি। আগামীতেও হয়তো দেখব। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—কী করলে উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদী মৌলিক দুটি লক্ষ্য ‘গণতন্ত্র’ ও ‘বৈষম্য নিরসন’ (অগাস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যা পুনরায় বিশেষভাবে সামনে এসেছে)-এর দিকে অগ্রগতি বিঘ্নিত হবে না বরং ধাপে ধাপে দেশ সেদিকে এগিয়ে যাবে? সেই সুস্পষ্ট কর্মসূচিটি আগে প্রণয়ন করতে হবে এবং এই মুহূর্তে সেটি প্রণয়ন করে নির্বাচনী ইশতেহারে তা তুলে ধরতে হবে। বামপন্থী, প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদ-আধিপত্যবাদ বিরোধী দেশপ্রেমিক শক্তির প্রার্থীদের জনগণের মধ্যে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।