ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম,ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ প্রতিনিধি,শনিবার ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ || ফাল্গুন ১ ১৪৩২ :
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল বিশ্বরোড থেকে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আবদুল ফারুকের সিএনজিচালিত অটোরিকশায় উঠে বসলাম আমরা। গন্তব্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানার বাসা। ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ধরে সরাইল উপজেলার শাহবাজপুরের দিকে যাচ্ছেন ফারুক। এক ফাঁকে বললেন, পছন্দের প্রার্থী রুমিন ফারহানার বড় বিজয়ে তিনি অনেক খুশি। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, আজকে গাড়ি চালাবেন না। আমরা রুমিনের বাসায় যাব শুনে তিনি খুশি মনে রাজি হয়েছেন।
Advertisement
অপরাধমূলক সংবাদ পাঠান
——————————-
আপনি অপরাধমূলক সংবাদ পাঠাতে পারেন লিখা ও ভিডিও এবং চিত্রসহ প্রধান সম্পাদক মোঃ ইসমাইল হোসেন দ্বায়ী থাকবেন। আপনার নাম ও ঠিকানা এবং মোবাইল নাম্বার গোপন থাকবে। লিখুন আমার ফেইজ বুকে Md Ismail Hossain অথবা ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম।মোবাইল: ০১৭১৪৪৯৭৮৮৫
——————————————
সিএনজিচালকের কথা শুনে বেশ কৌতূহল হলো। খুশিতেই কিনা মহাসড়কে বেশ জোরেই রিকশা চালাচ্ছিলেন তিনি। ধীরে চালাতে বললে, গতি কমালেন। শাহবাজপুরে রুমিন ফারহানার বাসার সামনে নামলাম। নির্ধারিত সময়ের আগে পৌঁছে যাওয়ায় ফারুকের সঙ্গে আলাপ জুড়ে দিলাম। প্রথমেই জানতে চাইলাম, আপনার এত খুশির কারণ কী? আপনি কি রুমিন ফারহানার কর্মী?
আবদুল ফারুক জানালেন, জীবনে কখনো রাজনীতি না করলেও নিজের ভালো লাগা থেকেই রুমিন ফারহানার জন্য ভোট চেয়েছেন। সিএনজির যাত্রীদের পাশাপাশি সিএনজিচালকদের মধ্যে প্রচার চালিয়েছেন। তাঁর কথা শুনে নাসিরনগর উপজেলার এক ব্যক্তি রুমিনকে নির্বাচন করার জন্য ৫০ হাজার টাকা অনুদানও দেন। বললেন, দিনে সিএনজি চালিয়ে ১ হাজার ৭০০-১ হাজার ৮০০ টাকা রোজগার হয়। এর মধ্যে গাড়ির মালিককে ৫০০ টাকা জমা দিতে হয়।
ততক্ষণে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী রুমিন ফারহানাকে অভিনন্দন জানাতে বিভিন্ন এলাকা থেকে তাঁর বাসভবনে জড়ো হতে শুরু করেছেন নেতা–কর্মীরা। এই নেতা–কর্মীদের কয়েকজনের সঙ্গে আমাদের কথা হলো। এর আগের দুই দিনে বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের সঙ্গে কথা হয়। তাতে বোঝা গেল, মোটাদাগে চারটি কারণে বড় জয় পেয়েছেন রুমিন ফারহানা।
প্রথমত, সৎ ও সাহসী নেতৃত্বের কারণে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারী ভোটারদের অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছেন তিনি। নির্বাচনী প্রচারে যেখানেই সভা বা উঠান বৈঠক করেছেন, সেখানেই নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। ভোটের দিন বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
দ্বিতীয়ত, বিএনপির দুঃসময়ে বড় কান্ডারি হওয়ায় দলের স্থানীয় নেতা–কর্মী ও সমর্থকদের আস্থা অর্জন করেন। এ জন্য দল মনোনয়ন না দিলেও স্বতন্ত্র থেকে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তখন দল তাঁকে বহিষ্কার করলেও মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বড় একটি অংশ তাঁর পক্ষে কাজ করেন।
তৃতীয়ত, গত দেড় বছরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীরা হয়রানিমূলক মামলায় এলাকাছাড়া। বিএনপির নেতা–কর্মীদের কারও কারও বিরুদ্ধ মামলা–বাণিজ্য ও চাঁদাবাজির অভিযোগও আছে। ফলে রুমিন ফারহানা আওয়ামী লীগ নেতা–কর্মীদের নীরব সমর্থন পেয়েছেন। তাঁরা নিজেরা ভোট দিতে না গেলেও পরিবার–পরিজনকে পাঠিয়েছেন।
চতুর্থত, বিএনপি জোটের প্রার্থী তেমন কোনো প্রতিশ্রুতি না দিলেও রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, গ্যাস–সংযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন রুমিন ফারাহানা। এতে করে ভোটাররা আশাবাদী হয়েছেন। এ ছাড়া রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠা রুমিন ফারহানার পৈতৃক বাড়ি এই আসনে। তবে বিএনপি জোটের প্রার্থীর পৈতৃক বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্য আসনে।
সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগর উপজেলার আংশিক এলাকা নিয়ে গঠিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৯৯ হাজার ৪৪৮ জন। এই আসনে প্রার্থী ছিলেন নয়জন। তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা (হাঁস প্রতীক) ও বিএনপি জোটের প্রার্থী জমিয়তে উলামায়ের মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবের (খেজুরগাছ প্রতীক) মধ্যে। পোস্টাল ব্যালট ও ১৫১টি ভোটকেন্দ্র মিলিয়ে হাঁস প্রতীক পেয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৪৭ ভোট। আর প্রতিদ্বন্দ্বী খেজুরগাছ প্রতীক পেয়েছে ৮০ হাজার ৪৩৪ ভোট।
রুমিন ফারহানা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০১৯ সালে সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির পক্ষে সংসদ সদস্যও হন। এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন চেয়েছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক এই সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক। তবে দল মনোনয়ন না দিলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ায় ৩০ ডিসেম্বর তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁর পক্ষে কাজ করায় ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের প্রায় ২০০ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়।
রুমিন ফারহানার পক্ষে কাজ করতে গিয়ে শাহবাজপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মুন্সি আমান মিয়া বহিষ্কার হন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দল থেকে শাস্তির মুখোমুখি হলেও মাঠপর্যায়ের ৬০ শতাংশ নেতা-কর্মী হাঁসের পক্ষে কাজ করেছেন। কারণ, রুমিন ফারহানা দলের দুঃসময়ের কান্ডারি ছিলেন। সৎ ও সাহসী নেতৃত্বের কারণে সাধারণ মানুষ তাঁকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়েছেন।
আশুগঞ্জ থেকে অভিনন্দন জানাতে আসা কর্মী আলী হোসেন বলেন, ‘আশুগঞ্জ উপজেলায় আমাদের খুব বেশি কষ্ট করতে হয় নাই। তার কারণ, গত দেড় বছরে স্থানীয় বিএনপির নেতা–কর্মীদের কর্মকাণ্ডে সাধারণ ভোটাররা বিরক্ত ছিলেন। সে জন্য উপজেলাটির মানুষ ভোটকেন্দ্রে এসেছেন কম। তবে যাঁরা এসেছেন তাঁরা হাঁসে ভোট দিয়েছেন।’
রুমিন ফারহানার বাবা ভাষাসংগ্রামী প্রয়াত অলি আহাদ ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে জয়ী হয়েছিলেন। তবে সরকারিভাবে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছিল তাহের উদ্দিন ঠাকুরকে। পরবর্তী সময়ে অলি আহাদ নিজে রাজনৈতিক দল গঠন করেন। ফলে ছোটবেলা থেকেই রাজনৈতিক পরিবেশে বড় হয়েছেন রুমিন।
নির্বাচনের প্রচারে শুধু গত দুই সপ্তাহে প্রায় ৪০টি সভা করেন রুমিন ফারহানা। প্রতিটি সভায় নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখা যায়। সেসব সভার খরচ স্থানীয় বাসিন্দারা দিয়েছেন। অনেকে নির্বাচনী খরচের জন্য নিজে থেকেই রুমিন ফারহানাকে অর্থ সহায়তা দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে মধ্যবিত্ত যেমন ছিলেন, তেমনি হতদরিদ্ররাও ছিলেন।
Advertisement
প্রতিটি উপজেলায় সংবাদদাতা আবশ্যক। যোগাযোগ ০১৭১৪৪৯৭৮৮৫

জানতে চাইলে রুমিন ফারহানা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার জয়ের পেছনে নারীদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি ছিল। অনেকে বলছেন, স্বামী হয়তো অন্য প্রার্থীকে সমর্থন করেছেন, তবে স্ত্রী বলেছেন তিনি আমাকে ভোট দেবেন। আমি নারী ভোটারদের আশ্বাস দিয়েছি, তাঁরা সহজে আমার কাছে আসতে পারবেন। নিজেদের সমস্যা জানাতে পারবেন। নারীরা আমার ওপর আস্থা রেখেছেন।’ তিনি আরও বলেন,‘ প্রশাসন পুরোপুরি আমার বিপক্ষে ছিল। প্রশাসন যেকোনো মূল্যে বিএনপির জোটের প্রার্থীকে জেতানোর চেষ্টা করেছিল। শুরু থেকে প্রশাসন আমার সঙ্গে বৈষম্যমূলক, অবমাননাকর আচরণ করেছে। তবে সেনাবাহিনী কার্যকর ভূমিকা রেখেছে বলেই আমি ভোট করতে পেরেছি। পুলিশও সহযোগিতা করেছে।’

চার কারণে রুমিন ফারহানার বড় জয়


