(ভিডিও)দীর্ঘ ৩৪ বছরের মমতাময়ী সেবা ঘোড়ার গাড়িতে রাজকীয় বিদায়, ফুলের পাপড়িতে সিক্ত ‘শেফালি খালা’

SHARE

ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম,নওগাঁ সদর উপজেলা প্রতিনিধি, বৃহস্পতিবার,০১ অক্টোবর ২০২৬,১৪ কার্তিক ১৪৩৩১৯ রবিউস সানি ১৪৪৮ :

একদিকে শিক্ষকদের কাজের ব্যস্ততা, অন্যদিকে শত শত চঞ্চল শিক্ষার্থীর হইচই। এই সবকিছুর মাঝে এক চিলতে শান্তির ছায়া হয়ে যিনি দাঁড়িয়ে থাকতেন, তিনি শেফালি বেগম। পদমর্যাদায় তিনি হয়তো একটি বিদ্যালয়ের ‘আয়া’ ছিলেন, কিন্তু দীর্ঘ ৩৪ বছরের একনিষ্ঠ সেবায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন সবার প্রিয় ‘শেফালি খালা’- এক পরম মমতাময়ী মা।

  • Advertisement

  • আপনি অপরাধমূলক সংবাদ পাঠাতে পারেন লিখা ও ভিডিও এবং চিত্রসহ প্রধান সম্পাদক মোঃ ইসমাইল হোসেন দ্বায়ী থাকবেন। আপনার নাম ও ঠিকানা এবং মোবাইল নাম্বার গোপন থাকবে। লিখুন আমার ফেইজ বুকে Md Ismail Hossain অথবা ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম।মোবাইল: ০১৭১৪৪৯৭৮৮৫,০১৮০৬৬৭৬৬৬৩

নওগাঁ সদর উপজেলার ফতেপুর (১ম) উচ্চ বিদ্যালয়ে দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন শেষে ৩০ সেপ্টেম্বর অবসরে যান তিনি। তার এই বিদায়লগ্নে বিদ্যালয় চত্বরে নেমে আসে এক অভূতপূর্ব আবেগঘন পরিবেশ, যা সচরাচর কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিদায়বেলায়ও দেখা যায় না।

সংসারহীন জীবনে বিদ্যালয়ই ছিল শেফালির পরিবার। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অবিবাহিত। নিজের কোনো ঘর-সংসার কিংবা সন্তান নেই। কিন্তু এই নিঃসঙ্গতা তাকে কখনো গ্রাস করতে পারেনি। কারণ, বিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থীকেই তিনি নিজের সন্তান মনে করতেন। পরম স্নেহে শিক্ষার্থীদের টিফিনের খোঁজ নেয়া, মায়ায় জড়িয়ে তাদের ভুলত্রুটি শুধরে দেয়া আর কেউ অসুস্থ হলে মায়ের মতো পরম যত্নে আগলে রাখার কারণে তিনি ছিলেন সবার নয়নের মণি। শিক্ষকদের ফরমায়েশ খাটতে গিয়ে নিজের ক্লান্তিকেও কখনো প্রশ্রয় দেননি তিনি।

শেফালি বেগমের অবসরের দিনে পুরো বিদ্যালয় জুড়ে এক শোকাতুর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সবাই অশ্রুসজল। যে মানুষটি এতগুলো বছর ধরে আড়ালে থেকে নিঃশব্দে বিদ্যালয়ের চাকা সচল রেখেছিলেন, তার ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন করেছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিদায় অনুষ্ঠানে তাকে বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। শ্রদ্ধার স্মারক হিসেবে তার হাতে তুলে দেয়া হয় সংবর্ধনা উত্তরীয়, নগদ অর্থ ও বিভিন্ন উপহার সামগ্রী।

দুপুরে বিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় তার বিদায়ী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নওগাঁ জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও ফতেপুর উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি-নূর-ই আলম মিঠু।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদান করেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাজ্জাদুল ইসলাম, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য লিটন হোসেন, অন্যান্য অতিথি, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বক্তব্য প্রদান করেন।

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি নূর-ই-আলম মিঠু বলেন, শেফালি বেগম আমাদের বিদ্যালয়ের শুধু একজন কর্মচারী ছিলেন না, তিনি ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম এক স্তম্ভ। দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে তিনি যেভাবে প্রতিটি শিক্ষককে সম্মান করেছেন এবং প্রতিটি শিক্ষার্থীকে সন্তানের মতো ভালোবেসে আগলে রেখেছেন, তা আমাদের সবার জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা। পদের দিক থেকে কেউ বড় বা ছোট হতে পারে, কিন্তু তার কর্তব্যপরায়ণতা এবং মমত্ববোধ আমাদের সবার চেয়ে অনেক উঁচুতে। তার এই নিঃস্বার্থ সেবার ঋণ ফতেপুর উচ্চ বিদ্যালয় কোনোদিন শোধ করতে পারবে না। আমরা তার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।

বিদায়ী সংবর্ধনায় শেফালি বেগম আবেগাপ্লুত হয়ে সবার কাছে দোয়া প্রার্থনা করেন। অনুষ্ঠানের সবচেয়ে মানবিক ও নজরকাড়া দৃশ্যটি তৈরি হয় বিদায়ের ঠিক পর মুহূর্তে। সাধারণত সমাজের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা প্রধান শিক্ষকদের বিদায়বেলায় বিশেষ সম্মান জানানো হলেও, গুণী নারী শেফালীর ক্ষেত্রে ফতেপুর উচ্চ বিদ্যালয় এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তাকে অত্যন্ত মর্যাদা ও ভালোবাসার সঙ্গে একটি সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে করে পৌঁছে দেয়া হয় নিজ বাড়িতে। যাওয়ার সময় শত শত শিক্ষার্থী ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে তাকে শ্রদ্ধা জানায়।

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভালোবাসার অশ্রুতে সিক্ত হয়ে, সেই রাজকীয় ঘোড়ার গাড়িতে চড়েই বাড়ি ফিরে যান শেফালি বেগম। যাওয়ার সময় শিক্ষার্থীদের কান্না ও ভালোবাসায় উপস্থিত সকলেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

  • Advertisement

কাজের ছোট-বড় দিয়ে মানুষের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় না। সততা, নিষ্ঠা ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করতে পারলে প্রাতিষ্ঠানিক পদের গণ্ডি পেরিয়েও এমন রাজকীয় সম্মান অর্জন করা সম্ভব। ফতেপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ইতিহাসে শেফালি বেগম চিরকাল মায়াবী এক মায়ের প্রতিচ্ছবি এবং এক সুমহান অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে থাকবেন।