ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম,পাবনার চাটমোহর প্রতিনিধি, সোমবার,২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,১৩ আশ্বিন ১৪৩৩১৬ রবিউস সানি ১৪৪৮ :
১৯ বছর ধরে শারমিন খাতুনের স্বামী মালয়েশিয়া প্রবাসী। নিজের সম্বল বলতে শুধু বসতভিটা। আবাদি জমি নেই। সংসারের কাজের পাশাপাশি ইচ্ছা ছিল কিছু করার। আবার দীর্ঘ বছর বিদেশে থেকে এসে স্বামী কী করবেন, সেই পরিকল্পনা থেকে ভিন্ন কিছু চাষাবাদ করার লক্ষ্যে লিজ নেওয়া জমিতে মাল্টা চাষ শুরু করেন। আর তাতেই বাজিমাত। ঈর্ষাণীয় সাফল্য পেয়েছেন। মাল্টা চাষ শারমিনের এনে দিয়েছে সফল নারী উদোক্তার পরিচিতি।
-
Advertisement

-
আপনি অপরাধমূলক সংবাদ পাঠাতে পারেন লিখা ও ভিডিও এবং চিত্রসহ প্রধান সম্পাদক মোঃ ইসমাইল হোসেন দ্বায়ী থাকবেন। আপনার নাম ও ঠিকানা এবং মোবাইল নাম্বার গোপন থাকবে। লিখুন আমার ফেইজ বুকে Md Ismail Hossain অথবা ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম।মোবাইল: ০১৭১৪৪৯৭৮৮৫,০১৮০৬৬৭৬৬৬৩
বলছি, পাবনার চাটমোহর উপজেলার ডিবিগ্রাম ইউনিয়নের হোগলবাড়িয়া গ্রামের গৃহবধূ শারমিন খাতুনের কথা। যিনি উপজেলাব্যাপী পরিচিতি পেয়েছেন ‘মাল্টা ভাবি’ হিসেবে। তার উৎপাদিত মাল্টা স্থানীয় বাজারে আমদানি করা বিদেশি মালটার সঙ্গে সমানভাবে টেক্কা দিচ্ছে।
আকৃতি, স্বাদ ও মানেও বিদেশি মাল্টার চেয়ে কমতি নেই। শারমিন খাতুনের বাগানের মাল্টা সবুজ বর্ণের হওয়ায় বাজারে দামের প্রতিযোগিতায় কিছুটা পিছিয়ে পরলেও উদ্যোমে ভাটা পড়েনি তার। বাণিজ্যিক সফলতা পেতে নতুনভাবে আরও এক বিঘা জমিতে অস্ট্রেলিয়ার হলুদবর্ণের মাল্টা চাষ সম্পসারণ করেছেন শারমিন।
সফল এই নারী উদ্যোগতার মাল্টা চাষের সফলতা গল্প এখন মানুষের মুখে মুখে। নতুন কৃষি উদ্যোক্তাদের কাছে, বিশেষ করে নারীদের কাছে এখন অনুকরণীয় নাম শারমিন খাতুন।
শারমিন খাতুন হোগলবাড়িয়া গ্রামের মালয়েশিয়া প্রবাসী মো. আব্দুল খালেকের স্ত্রী। মালেক ২০০৭ সাল থেকে প্রবাসী। তাদের সংসারে রয়েছে এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে এ বছর এসএসসি পাস করেছে। মেয়ে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়াশোনা করছে।
শুরুর গল্পটা ২০২০ সালের দিকে। করোনা মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে তরুণরা যখন কৃষিকে আঁকড়ে ঘুড়ে দাঁড়ানোর চেষ্টায় স্বপ্ন বুনছে, তখন অন্যদের মতো নারী উদ্যোক্তা শারমিন খাতুনও কৃষিতে আত্মনিবেশ করেন। অন্যদের মতো সহজ পথে না হেঁটে কৃষিতে তিনি গ্রহণ করেন নতুন চ্যালেঞ্জ।
শারমিন জানান, অন্য ব্যবসায় লোকসানের আশঙ্কা আছে। আর গতানুগতিক ব্যবসার চেয়ে নতুন কিছু জিনিস চাষাবাদকে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, যাতে বাজারে ভালো দাম পাওয়া যায়। সেই চিন্তা থেকে মাল্টা চাষের পরিকল্পনা করা।
তিনি বলেন, ‘‘আর একটা বিষয় হলো আমার স্বামী বিদেশে থাকেন। তিনি যাতে দেশে এসে ভালো কিছু করতে পারেন, কোনো সমস্যায় পড়তে না হয়; সেই চিন্তা থেকেও মাল্টা চাষে আগ্রহ হয়।’’
আলাপকালে শারমিন জানান, এরপর পাঁচ বছর মেয়াদে লিজ নেওয়া ২ বিঘা জমিতে ভিয়েতনামী ও বারি-১ জাতের মাল্টার বাগান গড়ে তোলেন। ২০২৩ সালে প্রথম ফলন আসা শুরু হয়। প্রথম বছর গাছের যত্নের কারণে খুব একটা বিক্রি করতে পারেননি। তবে ২০২৫ সাল থেকে ভরপুর ফলন আসছে।
জমির লিজ বাবদ খরচ ও পরিচর্যা খরচ মিটিয়ে ২০২৪-২৫ সালে লাভ করেন ২ লক্ষাধিক টাকা। এ বছরও ফলের ভারে গাছ নুয়ে পড়েছে। থোকায় থোকায় ঝুলছে মাল্টা। গাছের মাল্টার হাসিতে হাসির ঝিলিক এখন শারমিন খাতুনের মুখেও। এ বছর দুই বিঘা জমির মাল্টার বাগান থেকে ৪ লাখ টাকার আয়ের স্বপ্ন দেখছেন এ নারী উদ্যোক্তা।
গ্রামের শেষ মাথায় রেললাইনের ধারে প্রত্যন্ত গ্রামের যোগাযোগের প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়েও শারমিন খাতুনের ফলানো মাল্টা দেখতে মানুষ দলে দলে ভিড় করছেন। কেউ চাষ পদ্ধতি জানছেন, কেউ শুনছেন লাভের হিসাব। মাল্টা চাষের সফলতা শারমিন খাতুনকে যেমন উপজেলাব্যাপী ‘মাল্টা ভাবি’ হিসেবে পরিচিত করছে, তেমনি তিনি হয়ে উঠেছেন নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য অনুকরণীয়।
শারমিন খাতুন বলেন, শুরুর দিকে মাল্টার বাগান করা নিয়ে আশপাশের অনেকেই কটাক্ষ করলেও তিনি থেমে যাননি । বরং স্বপ্ন ছিল সফল হওয়ার। সফল হয়েছেনও। যে জমিতে মাল্টার বাগান করেছেন, সেখানে উচ্চ মূল্যের ফসল চাষ করা সম্ভব ছিল না। প্রচলিত চাষাবাদ করে এ জমি থেকে লাভ করা ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। অথচ সেখানে মাল্টার বাগান করে হাসছেন তিনি।
তিনি জানান, মাল্টা চাষে সফল হওয়ায় আরও এক বিঘা জমিতে নতুনভাবে বাগান করেছেন। তার মতে, তার বাগানের মাল্টা সবুজবর্ণের কারণে কিছুটা দাম কম পান। সেজন্য বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকতে হলুদ জাতের নতুন মাল্টার বাগান করেছেন তিনি।
কামালপুর ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম জানান, শারমিন খাতুন মাল্টার বাগান করেছেন জানতে পেরে তিনি নিয়মিত তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। মাল্টার চাষ অন্যান্য ফসলের চেয়ে ব্যতিক্রম হওয়ায় পরামর্শ প্রদান ও তার জন্য উপজেলায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন।
সমতলে মাল্টা চাষ ও কমলা চাষ দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে জানিয়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সাইদুর রহমান সাঈদ জানান, চাটমোহর উপজেলায় বেশ কয়েকটি মাল্টার বাগান গড়ে উঠলেও শারমিন খাতুন যে সফলতা পেয়েছেন, তা অনন্য। মূলতঃ ভিয়েতনামী জাতের মাল্টা সারা বছরে ফলন দেওয়ার কারণে লাভ বেশি হয়। রস ও মিষ্টতাও অন্যান্য জাতের তুলনায় বেশি।
এ বিষয়ে চাটমোহর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ কুন্তলা ঘোষ বলেন, শারমিন খাতুনের মতো উদ্যোগী কৃষকদের কৃষি অফিস বিশেষ যত্ন করে থাকে। তাকে এ বিষয়ে প্রশিক্ষন দিয়েছেন। ফল মেলায় শারমিন খাতুনের মাল্টা প্রদর্শন করার পর অনেক কৃষক তার সফলতায় মাল্টা চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। আশা করা যায়, উপজেলায় দিন দিন মালটা চাষ সম্পসারিত হবে।
-
Advertisement

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, চাটমোহর উপজেলায় ১৫ বিঘা জমিতে মাল্টা চাষ হচ্ছে। ২৩ থেকে ২৪ জন কৃষক মাল্টা চাষে সফলতা পেয়েছেন।

মাল্টা চাষে গৃহবধূ শারমিনের বাজিমাত


