ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম,সবার দেশ পত্রিকার সৌজন্যে, শুক্রবার ০১ মে ২০২৬ || বৈশাখ ১৮ ১৪৩৩ || ১৩ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি :
জাতীয় সংসদে টানা ৩৩ মিনিটের বক্তব্য দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন, সোশ্যাল মিডিয়ায় এবং তরুণ সমাজে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। রাষ্ট্রপতির ভূমিকা থেকে শুরু করে সংবিধান, জুলাই সনদ, মুক্তিযুদ্ধ, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, ঋণখেলাপি, দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা, কৃষক, কর্মসংস্থান ও বিরোধীদলের স্বাধীনতা—প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু নিয়েই কড়া ভাষায় বক্তব্য দেন তিনি।
তার বক্তব্যের পরপরই ফেসবুকসহ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশংসার ঝড় ওঠে। অনেকেই তাকে ‘Poet of Parliament’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কেউ লিখেছেন, এটি ছিলো সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে প্রাণবন্ত সংসদীয় ভাষণ, আবার কেউ মন্তব্য করেছেন, একজন তরুণ নেতা কীভাবে সংসদ কাঁপাতে পারে, তার উদাহরণ নাহিদ ইসলাম।
Advertisement
অপরাধমূলক সংবাদ পাঠান
——————————-
আপনি অপরাধমূলক সংবাদ পাঠাতে পারেন লিখা ও ভিডিও এবং চিত্রসহ প্রধান সম্পাদক মোঃ ইসমাইল হোসেন দ্বায়ী থাকবেন। আপনার নাম ও ঠিকানা এবং মোবাইল নাম্বার গোপন থাকবে। লিখুন আমার ফেইজ বুকে Md Ismail Hossain অথবা ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম।মোবাইল: ০১৭১৪৪৯৭৮৮৫
——————————————
রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে কড়া সমালোচনা
রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবে অংশ নিয়ে শুরুতেই সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন-এর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, যে রাষ্ট্রপতিকে কেন্দ্র করে অতীতে বিভিন্ন বিতর্ক ছিলো, আজ তাকে নিয়েই গর্ব করা হচ্ছে।
এ সময় তিনি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন—বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান-এর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলার বিচার, পদ্মা সেতু দুর্নীতি ইস্যুতে আওয়ামী লীগকে ক্লিনচিট দেয়া এবং ওয়ান-ইলেভেনের সময়ের দুর্নীতির অভিযোগ বাতিলের প্রসঙ্গ।
তিনি আরও দাবি করেন, ২০০৯ সালে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগে বিএনপির হাজারো নেতাকর্মীকে অভিযুক্ত করার বিচারিক প্রতিবেদনের নেতৃত্বেও ছিলেন ওই রাষ্ট্রপতি। একই সঙ্গে এস আলম গ্রুপের হাতে ইসলামী ব্যাংকসহ ব্যাংক খাত তুলে দেয়ার অভিযোগও তোলেন তিনি।
সংবিধান নিয়ে বিতর্কিত কিন্তু জোরালো অবস্থান
সংবিধান প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, বাহাত্তরের সংবিধান নতুন করে মূল্যায়নের সময় এসেছে। তার ভাষায়, স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা এ সংবিধান লেখেননি।
তিনি দাবি করেন, ওই সংবিধান একজন ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার কাঠামো তৈরি করেছিলো। এ সময় তিনি এ সংবিধানের বিরুদ্ধে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, মাওলানা ভাসানী, বদরুদ্দিন ওমর ও কর্নেল মোজাফফর আহমদের অবস্থানের কথাও উল্লেখ করেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনায় ছিলো সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার; কিন্তু পরে তা ভিন্ন রাজনৈতিক কাঠামোয় রূপ দেয়া হয়।
জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপিকে নিশানা
জুলাই সনদ প্রসঙ্গে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, বিএনপি ‘Note of Dissent’ দিয়ে সনদটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তার অভিযোগ, নির্বাচন-পূর্ব প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বর্তমান অবস্থানের মিল নেই।
তিনি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্দলীয় নিয়োগব্যবস্থা, বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ ও কাঠামোগত সংস্কারের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। তার ভাষায়, ‘এগুলো হঠাৎ করে বলা কথা নয়, বরং গত ১৭ বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসেছে।’
মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে অবস্থান
সংসদে দেয়া বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম বলেন, ৭১ ও ২৪ পরস্পরবিরোধী নয়, বরং একই ধারাবাহিকতার অংশ। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু রাজনৈতিক বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই অভ্যুত্থানকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা কখনও বলিনি জুলাই অভ্যুত্থান মুক্তিযুদ্ধের চেয়ে বড়।
এ সময় তিনি বিএনপির দীর্ঘদিন জামায়াতের সঙ্গে জোট রাজনীতির প্রসঙ্গও টানেন এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে দ্বৈত অবস্থানের সমালোচনা করেন।
জুলাই আন্দোলনের কৃতিত্ব নিয়ে বক্তব্য
জুলাই আন্দোলনের কৃতিত্ব নিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপি আন্দোলনে ছিলো—এটি তারা স্বীকার করে। তবে আন্দোলনের মূল শক্তি ছিলো সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা।
তিনি দাবি করেন, আন্দোলনের সময় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের মুখ থেকে ‘এটি বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলন’ বলানোর চেষ্টা করেছিলো। কিন্তু তারা তা বলেননি, কারণ এতে আন্দোলনের চরিত্র নষ্ট হতো।
ভারত প্রসঙ্গে প্রশ্ন
ভারতের সঙ্গে বর্তমান সরকারের সম্পর্ক নিয়েও কড়া প্রশ্ন তোলেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, সীমান্ত হত্যা বন্ধ হয়নি, পানি বণ্টনের সমাধান হয়নি, বরং নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
তিনি দাবি করেন, পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া বিপুলসংখ্যক মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা হতে পারে। একই সঙ্গে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেয়ার প্রসঙ্গও টানেন তিনি।
ঋণখেলাপি এমপিদের বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি
বক্তব্যে কয়েকটি বড় অঙ্কের ঋণের পরিসংখ্যান তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, কিছু সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকার ঋণখেলাপির অভিযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, আজ শুধু সংখ্যাগুলো বললাম, পরের সেশনে নামও বলবো। এ সময় সংসদে উত্তেজনা তৈরি হয়।
দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে তোপ
নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুর্নীতির প্রশ্নে সমন্বয়কদের এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেনো তারাই দেশের সবচেয়ে বড় দুর্নীতিবাজ। সংসদকে এ দুর্নীতি প্রমাণ করার চ্যালেঞ্জ করেন তিনি।
তিনি ২০০১-২০০৬ সময়কার দুর্নীতির বিচারও দাবি করেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও হামলার বিভিন্ন ঘটনার পরিসংখ্যান তুলে ধরেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিক ও ডাকসু প্রতিনিধিদের ওপর হামলার বিচার দাবি করে তিনি বলেন, এখনও হামলাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়নি।
এ ছাড়া কুষ্টিয়ায় মাজারে হামলা ও হত্যাকাণ্ডের বিচারও দাবি করেন তিনি।
কৃষক, কর্মসংস্থান ও তরুণদের ভবিষ্যৎ
কৃষকদের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের দাবি জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, কৃষক কার্ড দেয়া হলেও তারা কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাচ্ছেন না।
তরুণদের কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ অভ্যুত্থানের অন্যতম কারণ ছিলো বেকারত্ব ও বৈষম্য। তিনি চাকরিতে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও নিয়োগবাণিজ্যের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়ার আহ্বান জানান।
বিরোধীদলের স্বাধীনতা নিয়ে বক্তব্য
বিরোধীদলকে ‘প্রেসক্রিপশন’ অনুযায়ী চলতে বলা হচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিরোধীদল কীভাবে কথা বলবে, তা সরকার নির্ধারণ করতে পারে না।
এ সময় তিনি নিজের পরিবার ও রাজনৈতিক সংগ্রামের কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ছাত্রজীবন থেকেই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন।
নিজ এলাকা ও শিক্ষার্থীদের প্রসঙ্গ
বক্তব্যের শেষদিকে নিজের নির্বাচনী এলাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ঢাকা-১১ এলাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা জুলাই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলো।
তিনি ওই এলাকার উন্নয়ন ও বৈষম্যহীন সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশংসার ঝড়
নাহিদ ইসলামের বক্তব্যের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ লিখেছেন, সংসদে নতুন প্রজন্মের কণ্ঠস্বর পাওয়া গেলো, আবার কেউ বলেছেন, দীর্ঘদিন পর সংসদে আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক ভাষণ শোনা গেলো।
Advertisement

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ বক্তব্য শুধু সংসদীয় বিতর্ক নয়, ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিকনির্দেশনাতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

ছবি: সংগৃহীত


