ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম,বিশেষ প্রতিনিধি, বুধবার ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ || ফাল্গুন ৫ ১৪৩২ :
বাংলাদেশে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের মিশন চালু হতে যাচ্ছে। তিন বছর মেয়াদি মিশন চালুর জন্য সমঝোতা স্মারক সই করেছে দুপক্ষ। পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বাংলাদেশের এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক জাতিসংঘের পক্ষে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছেন। এ ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। তারা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এর ফলে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে। তাই তারা দ্রুত এই সমঝোতা স্মারক থেকে বাংলাদেশকে বেরিয়ে আসারও পরামর্শ দিয়েছেন। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই মিশন চালুর উদ্দেশ্য হলো সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি সংগঠনগুলোর জন্য প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করা। যার মাধ্যমে তাদের সক্ষমতার উন্নয়ন, আইনি সহায়তা ও প্রাতিষ্ঠানিকতা শক্তিশালী হবে।
তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে সংকটাপন্ন এবং বিশৃঙ্খল রাষ্ট্র যেমন-কম্বোডিয়া, গুয়াতেমালা, মেক্সিকো, সুদান, ফিলিস্তিন, লিবিয়া এবং ইয়েমেনের মতো অস্থিতিশীল ১৮টি রাষ্ট্রে এই সংস্থার অফিস রয়েছে। সেখানেও মানবাধিকার পরিস্থিতির কোনো উন্নয়ন তারা দেখাতে পারেনি। তাছাড়া বাংলাদেশে সেরকম নেতিবাচক মানবাধিকার পরিস্থিতিও নেই। তাই এ দপ্তর ঢাকায় স্থাপনের কোনো প্রয়োজন নেই। ঢাকায় সংস্থার অফিস হলে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা যাবে এবং দেশের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও শঙ্কা তাদের।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, যেসব জায়গায় তারা অফিস করেছে, সেসব জায়গায় পরিবর্তনশীল উন্নতি হয়েছে, এটা তারা দেখাতে পারেনি। এছাড়া গাজার যে জেনোসাইড হচ্ছে, সেখানে হিউম্যান রাইটস কমিশন ভূমিকা রাখতে পারেনি। আমাদের হিউম্যান রাইটসের যে ঘাটতি, সেটা আমাদের জনগণকেই সমাধান করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে হয়তো করছে, সেটা আমাদের যে হিউম্যান রাইটসের ডেফিসিটটা আছে, সেটা তারা কোনোভাবেই পূরণ করতে পারবে না। বরং আরও নতুন সমস্যা তৈরি হবে। এতে ইনভেস্টররা কিন্তু খুব চিন্তিত থাকবে। ইনভেস্টের আগে ১০ বার চিন্তা করবে। তারা তো বেশি সময় নেবে না। তারা যখনই রিপোর্ট দেখবে যে, এখন এইখানে হিউম্যান রাইটস কমিশন আছে। তখন তারা মনে করবে আমি বরং অন্য দেশেই যাই।
সাবেক কূটনীতিক এম শফিউল্লাহ বলেন, সবচেয়ে বেশি মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে যেসব দেশে, সেসব দেশে তাদের কোনো অফিস নেই। যেমন- ইসরাইল হল পৃথিবীর ওয়াস্ট হিউম্যান রাইট ভায়োলেটর। সেখানে জাতিসংঘের কোনো অফিস নেই। মাইনরিটির উপরে সবচেয়ে বেশি অত্যাচার হচ্ছে ভারতে। সুতরাং হঠাৎ করে বাংলাদেশে এ ধরনের একটি অফিস করার কোনো যুক্তি আমরা দেখি না।
তিনি আরও বলেন, কোনো চুক্তি হয়নি। একটি আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়েছে। এর ভিতরে আমাদের দেখতে হবে কাজটা আমাদের দেশে করা সঠিক হবে কিনা। এটা জনমত যাচাই করতে হবে। এটা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলতে হবে। বিদেশি কোনো সংস্থাকে এনে আমাদের হিউম্যান রাইটসকে পাকাপোক্ত করা যাবে না।
জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর থেকে শুক্রবার এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বাংলাদেশে মানবাধিকার সুরক্ষা ও বিকাশের লক্ষ্যে মিশন চালুর বিষয়ে চলতি সপ্তাহে সমঝোতা স্মারকটি সই হয়েছে।
সংস্কার ও জবাবদিহিতার প্রতি সরকারের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন : এদিকে শনিবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এই মিশন চালুর উদ্দেশ্য হলো সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি সংগঠনগুলোর জন্য প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করা। যার মাধ্যমে তাদের সক্ষমতার উন্নয়ন, আইনি সহায়তা ও প্রাতিষ্ঠানিকতা শক্তিশালী হবে। এছাড়া বাংলাদেশকে তার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের বাধ্যবাধকতা পূরণে সহায়তা করাও এর লক্ষ্য। প্রেস উইং জানায়, এই উদ্যোগ বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরিপ্রেক্ষিতে সংস্কার ও জবাবদিহিতার প্রতি সরকারের অব্যাহত প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, আমরা স্বীকার করি, বাংলাদেশে কতিপয় গোষ্ঠী জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ভাবাদর্শগত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে গঠিত সমাজ। আমরা নাগরিকদের কাছ থেকে এমন প্রতিক্রিয়া পেয়েছি, যেকোনো আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব যেন এসব মূল্যবোধের প্রতি সম্মান দেখায়। সেই কারণে (ওএইচসিএইচআর)-এর এই মিশন মূলত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধ ও প্রতিকার, যেমন পূর্ববর্তী সরকারের দ্বারা সংঘটিত অপরাধগুলো নিশ্চিত করার ওপর কেন্দ্রীভূত থাকবে। এটি এমন কোনো সামাজিক এজেন্ডা প্রচারে ব্যবহৃত হবে না যা দেশের প্রথাগত আইনি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর বাইরে পড়ে।
আমরা আশা করি, এই মিশন সর্বদা স্বচ্ছতা এবং স্থানীয় অংশীজনদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বজায় রাখবে। জাতিসংঘ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বাস্তবতাকে পূর্ণ সম্মান জানিয়ে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
সরকার জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হলে নিজ সিদ্ধান্তে সমঝোতা থেকে সরে আসার সার্বভৌম কর্তৃত্ব সংরক্ষণ করে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
উল্লেখ্য, যদি এমন একটি কার্যালয় পূর্ববর্তী প্রশাসনের সময়ে বিদ্যমান থাকত, যখন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও জনসমক্ষে গণহত্যা অবাধে সংঘটিত হয়েছিল, তাহলে অনেক অপরাধই যথাযথভাবে তদন্ত, নথিভুক্ত এবং বিচারপ্রাপ্ত হতে পারত। আজকের মানবাধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি অবশ্যই আদর্শ নয়, ন্যায়বিচারের ওপর ভিত্তি করে হতে হবে।
Advertisement
প্রতিটি উপজেলায় সংবাদদাতা আবশ্যক। যোগাযোগ ০১৭১৪৪৯৭৮৮৫

সরকার এই অংশীদারত্বকে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানসমূহকে শক্তিশালী করা এবং আমাদের নাগরিকদের সুরক্ষা বাড়ানোর একটি সুযোগ হিসাবে বিবেচনা করছে-যা আমাদের মূল্যবোধ দ্বারা পরিচালিত, আমাদের আইন দ্বারা গঠিত এবং আমাদের জনগণের কাছে জবাবদিহিবদ্ধ থাকবে।


