অবসরের পরেও বিনা বেতনে ডিউটি

SHARE

ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম,ঢাকা প্রতিনিধি,০৩ এপ্রিল : প্রায় চার দশক আগে স্বাস্থ্য ও পরিবার মন্ত্রণালয়ের এমএলএস (অফিস সহকারী) পদে তিনি চাকরি নিয়েছিলেন। দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে ২০১৮ সালে চাকরি থেকে অবসরে গেলেও অফিস আর কাজের মায়া ছাড়তে পারেননি তিনি। অবসর নেওয়ার পরও দীর্ঘ ২১ মাস ধরে সম্পূর্ণ বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করে যাচ্ছেন, কর্মকর্তাদের সহায়তা-সেবা দিতে প্রতিদিন অফিসে আসেন এই বৃদ্ধ।

কর্মপাগল এই মানুষটির নাম মো. আব্দুর রহিম। ১৬ মার্চ সচিবালয় বিটের রিপোর্টার পরিচয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই নিজের পরিচয় দিতে চান না বলে জানান। তবে দেশের শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কমের এ রিপোর্টার ও মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তার অনুরোধে শুনিয়েছেন নিজের চাকরি জীবন ও কাজের প্রতি ভালবাসার গল্প।

তিনি জানান, কুমিল্লা থেকে ম্যাট্রিক (এসএসসি) পাস করেন ১৯৭৬ সালে। ১৯৭৯ সালের ১৭ মে অস্থায়ীভাবে যোগদান করেন। চাকুরী স্থায়ী হয় ১৯৮৩ সালের ১৭ মে। দীর্ঘদিন এ মন্ত্রণালয়ে কাজ করেছেন। দেখেছেন ও কাজ করেছেন একাধিক মন্ত্রীর সঙ্গে। ভাল মানুষ হওয়ায় সবাই তাকে আদর করেছেন। সর্বশেষ মন্ত্রণালয় থেকে ২০১৮ সালের ৯ জুন অবসরে যান।

তিনি বলেন, ‘২০১৮ সালের অবসর গ্রহণের দিন আগে আগে বাসায় ফিরে বসেছিলাম। রাতে হঠাৎ সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মোহাম্মদ নাসিম স্যারের এপিএস স্যারকে (মীর মোশাররফ) ফোন করি বলি, স্যার, আমাদের কর্মচারী সংকট আছে, আমি বিনা বেতনে চাকুরি করব। স্যার বললেন, “বিনা বেতনে কেউ কাজ করে?” বললাম, কেউ না করলেও আমি কাজ করব। কোনো পারিশ্রমিক নেব না। তিনি আপত্তি না করায় তারপর থেকে আজ অবধি কাজ করে যাচ্ছি।’

আব্দুর রহিমের দুই ছেলে, দুই মেয়ে, তারাও কেউ প্রতিষ্ঠিত নয়। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন, এক ছেলে একজন চিকিৎসকের চেম্বারে ছোট চাকরিকরি করে। আর বাকি এক ছেলে ও এক মেয়ে পড়াশোনা করছে। কুমিল্লা জেলার হোমনা উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়নের ভিটি কালমিনা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রহিম। বর্তমানে পরিবার নিয়ে রাজধানীর মহাখালীর আইপিএইচ কলোনি মসজিদের পাশে থাকেন বলে জানান তিনি।

আব্দুর রহিম বলেন, ‘এখানে যারা আসেন, তারা আমাকে সবাই চাচা বলে ডাকেন। তাদের ডাকে মনে হয়, সবাই আমার ভাতিজা, আমার সন্তানের মতো। নিজের সন্তান মনে করে দায়িত্ব হিসেবে আমি কাজ করে যাচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘পেশাটি আমার ভালোবাসার, এটি আত্মার সঙ্গে মিশে আছে। আমি আমার গুণীজন স্যারদের থেকে যা যা কিছু শিখেছি, তা এখানে কর্মরত চতুর্থ শ্রেণির কর্মরতদের কিছুটা হলেও শেখানোর চেষ্টা করি। ভালোবেসেই এ পেশাকে বেছে নিয়েছিলাম, তাই এখনও ছাড়তে পারিনি।’

কিছুটা উদাস হয়ে আব্দুর রহিম বলতে থাকেন, ‘বয়স হয়েছে, যে কোন সময় আল্লার ডাক আসতে পারে। তবুও যতদিন বেঁচে থাকি, ততদিন এই মহান পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকতে চাই। জীবনে আর চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। খোদার কাছে শুধু একটাই চাওয়া, সুস্থ থেকে বাকিটা জীবন যেন এভাবে কাটাতে পারি।’

আব্দুর রহিম চাচাকে পেয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রীর দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও খুব খুশি, কাজের ক্ষেত্রে তাদের অনেকের ভরসার জায়গা বৃদ্ধ মানুষটি, ভালবাসারও।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য অফিসার মাইদুল ইসলাম প্রধান ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কমকে বলেন, ‘চাচা (মো. আব্দর রহিম) আলোকিত মানুষ। এরকম ভাল মানুষ খুবই কম পাওয়া পাওয়া যায়। পারিশ্রমিক ছাড়াই তিনি শুধুমাত্র পেশাটিকে ভালোবেসে এখানে দীর্ঘদিন ধরে ডিউটি করে যাচ্ছেন। ’

তার সুস্থতা ও মঙ্গল কামনা করেন ওই বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।