
ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম,রাজধানীর খিলক্ষেত প্রতিনিধি,রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,২৮ ভাদ্র ১৪৩৩০১ রবিউস সানি ১৪৪৮:
চামড়ার বেল্ট দিয়ে স্বামী পেটাচ্ছেন। পাশের কক্ষে সন্তানদের কান্নাকাটি। স্বামীর অভিযোগ অস্বীকার করেও মারের হাত থেকে নিস্তার পাচ্ছিলেন না। গত সপ্তাহে এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভুক্তভোগী ওই নারীর নাম মুক্তা ইসলাম। তাঁর মৃত্যুর পর এই ভিডিও সম্পর্কে জানা যায়।
-
Advertisement

-
আপনি অপরাধমূলক সংবাদ পাঠাতে পারেন লিখা ও ভিডিও এবং চিত্রসহ প্রধান সম্পাদক মোঃ ইসমাইল হোসেন দ্বায়ী থাকবেন। আপনার নাম ও ঠিকানা এবং মোবাইল নাম্বার গোপন থাকবে। লিখুন আমার ফেইজ বুকে Md Ismail Hossain অথবা ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম।মোবাইল: ০১৭১৪৪৯৭৮৮৫,০১৮০৬৬৭৬৬৬৩
এ ঘটনার আলোচনা শেষ না হতেই নির্যাতনে আল মাইদা আক্তার (২০) নামের আরেক নারীর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে নেওয়ার পর মাইদাকে মৃত ঘোষণা করা হলে পালিয়ে যান স্বামী মো. সিয়াম আল মুরসালিন আকাশ (৩০)। স্থানীয় লোকজন পরে তাঁকে আটক করে পুলিশে দেন। পরিবারটির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মৃত্যুর দুই দিন আগে মারধরে জখম হওয়ার ছবি খালাতো বোনের কাছে পাঠিয়েছিলেন মাইদা। গালে ব্যান্ডেজ, চোখ ফোলা। মাইদা বলেছিলেন, ‘আপা, ও আমাকে আজও মারছে।’
মুক্তা ইসলামকে নির্যাতনের একটি ভিডিও তাঁর ভাই তানভীর রহমানের মুঠোফোনে পাঠিয়েছিলেন স্বামী সোহেল শিকদার। সঙ্গে লিখেছিলেন, ‘তোমার বোনকে নিয়ে যাও।’ ভিডিওতে দেখা যায়, মুক্তাকে খাটের সঙ্গে বেঁধে বেল্ট দিয়ে পেটানো হচ্ছে। পাশের কক্ষে সন্তানদের কান্না শুনে মুক্তা স্বামীকে বলেন, ‘আমাকে মারবা ঠিক আছে, শুধু দুই বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি।’ মারতে মারতে সোহেল বলছিলেন, ‘কথা ক, কথা ক, তোরে আজ পিটাইয়া মাইরা ফালামু।’ ৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর খিলক্ষেতের বাসায় সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, নির্যাতনের পর মুক্তাকে হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কম সময়ের ব্যবধানে দুটি মৃত্যুর ঘটনায় পরিবার দুটি থেকে জানা যায়, দুই নারীই স্বামীর কাছে নিয়মিত নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। নির্যাতন সহ্য করে তাঁরা সংসার করতেন। শেষ পর্যন্ত মৃত্যু হলো তাঁদের পরিণতি। পারিবারিক সহিংসতার ঘটনাকে অপরাধ না ভেবে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়ার কারণে নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে বলে মনে করছেন নারী অধিকারকর্মীরা।
এদিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯–এর কলের হিসাব অনুসারে, নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলোর মধ্যে স্বামীর হাতে নির্যাতনের অভিযোগই বেশি। এ বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত আট মাসে হত্যা, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, উত্ত্যক্ত করা, আত্মহত্যার প্ররোচনা, আটকে রাখা, স্বামী, মা-বাবা ও অন্যদের হাতে নির্যাতন, যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনসহ নানা অভিযোগে নারী নির্যাতনের মোট কল এসেছে ২৭ হাজার ৯১১টি। এর মধ্যে স্বামীর হাতে নির্যাতনের অভিযোগ ১৭ হাজার ১৯৬টি। অর্থাৎ মোট অভিযোগের প্রায় ৬২ শতাংশ স্বামীর বিরুদ্ধে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের কল এসেছে ৭০টি। গত বছর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত মোট কলের মধ্যে প্রায় ৫৮ শতাংশ ছিল স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ।
সন্তানদের কারণে সংসার ছাড়তে চাইতেন না মাইদা
সিয়ামদের বাড়ি গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের শালমারা গ্রামে। আর মাইদার মায়ের বাড়ি সাদুল্লাপুর উপজেলার ইদিলপুরে। প্রেমের সম্পর্ক থেকে ২০২১ সালে তাঁরা বিয়ে করেন। তাঁদের সংসারে চার ও এক বছর বয়সী দুটি ছেলেসন্তান রয়েছে। মাইদা পলাশবাড়ী সরকারি কলেজে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। দুই ভাই–বোনের মধ্যে মাইদা ছিলেন ছোট। তাঁর ভাই চীনে পড়াশোনা করছেন। বাবা শাহাজাদা মিয়ার মৃত্যুর পর মা মোছা. রহিমা খাতুন (৪৮) ভূমি অফিসে দলিল লেখার কাজ করে দুই সন্তানকে বড় করেন।
গতকাল মুঠোফোনে ঠিকভাবে কথা বলতে পারছিলেন না মা রহিমা খাতুন। তিনি আহাজারি করে বলছিলেন, বিয়ের পর থেকেই তাঁর মেয়েকে মারধর করতেন সিয়াম। এ নিয়ে একবার সালিসও হয়েছিল। ওই সময় সিয়াম তাঁকে বলেছিলেন, ‘পরিবারে স্বামী-স্ত্রীর একটু সমস্যা হতেই পারে। এসব মেনে নিতে হবে।’
রহিমা জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে তাঁকে জামাতা ফোন করে বলেন, মাইদা অসুস্থ। এখন পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। তিনি হাসপাতালে গিয়ে দেখেন মেয়ে বেঁচে নেই। জামাতা লাশ রেখে হাসপাতাল থেকে পালিয়েছেন। মেয়েকে হত্যার অভিযোগে রহিমা জামাতা সিয়ামসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করে শুক্রবার পলাশবাড়ী থানায় মামলা করেছেন।
মাইদার দুই শিশুসন্তান এখন নানির কাছে। এর মধ্যে বুকের দুধ না পেয়ে ছোট ছেলেটা সারা দিন কান্নাকাটি করে।
মোসাম্মৎ শাফিয়া, মাইদার খালাতো বোন
মাইদার খালাতো বোন মোসাম্মৎ শাফিয়া প্রথম আলোকে বলেন, সিয়ামের মা–বাবা বেঁচে নেই। একমাত্র বোন কাতারে থাকেন। মাইদা তাঁকে ফোন করে প্রায়ই জানাতেন যে স্বামী কথায় কথায় মারধর করে। সবশেষ মৃত্যুর দুই দিন আগে মাইদা তাঁকে একটি ছবি পাঠিয়ে বলেছিলেন, ‘আপা, ও আমাকে আজও মেরেছে।’ ছবিতে দেখা যায়, মাইদার মুখে আঘাতের চিহ্ন। চোখ ফোলা। গালের একপাশে ব্যান্ডেজ লাগানো।
ছবি দেখে আঁতকে উঠে শাফিয়া বলেন, ‘তুই কেন ওই সংসারে থাকিস। তুই চলে আয়।’ জবাবে মাইদা বলেছিলেন, সব সময়ই তো মারে। সন্তানেরা ছোট। সংসার ছেড়ে এলে সন্তানেরা কষ্ট নিয়ে বড় হবে।
শাফিয়া বলেন, মাইদার দুই শিশুসন্তান এখন নানির কাছে। এর মধ্যে বুকের দুধ না পেয়ে ছোট ছেলেটা সারা দিন কান্নাকাটি করে। তিনি দাবি করেন, মাইদার চার বছরের সন্তানের কাছ থেকে তাঁরা শুনেছেন, ‘মাকে বাবা অনেক মেরেছে। পরে ফ্যানে ঝুলিয়ে দিয়ে সুইচ ছেড়ে দিয়েছে। পরে বাবার বন্ধুরা ফ্যান থেকে মাকে নামিয়ে আনে।’ শাফিয়া জানান, মাইদাকে নামিয়ে নিজেদের মাইক্রোবাস চালিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যান সিয়াম।
পলাশবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সারওয়ার আলম খান প্রথম আলোকে বলেন, মাইদার গলায় দাগ ছিল। পুরোনো আঘাতের কিছু চিহ্ন ছিল। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গেলে মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে। সিয়াম পুলিশের কাছে বলেছেন, বিকেলে তাঁদের মধ্যে মারপিট হয়। পরে মাইদা ফ্যানের সঙ্গে ফাঁস দেন। তাঁর বন্ধুরা মিলে মাইদার অচেতন দেহ নামিয়ে আনেন। তিনি এরপর মাইদাকে নিয়ে হাসপাতালে যান।
পারিবারিক সহিংসতাকে অপরাধ ভাবা হচ্ছে না
দেশের স্বামী বা সঙ্গীর হাতে পারিবারিক সহিংসতা কতখানি প্রকট, তা উঠে এসেছে গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত প্রতিবেদনে। ‘নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জীবনসঙ্গী বা স্বামীর হাতে প্রায় ৭০ ভাগ নারী তাদের জীবদ্দশায় অন্তত একবার হলেও শারীরিক, যৌন, মানসিক ও অর্থনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন। ৪১ শতাংশ নারীর ক্ষেত্রে জরিপের সময়ের আগের ১২ মাসে এই সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতার প্রকৃতি, মাত্রা ও প্রভাবের চিত্র তুলে ধরতে বিবিএস ও ইউএনএফপিএর এটা ছিল তৃতীয় প্রতিবেদন। এর আগে ২০১৫ সালের প্রতিবেদনে ৭৩ শতাংশ ও ২০১১ সালের প্রতিবেদনে ৮০ শতাংশ নারী স্বামীর হাতে সহিংসতার শিকার হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
মাইদার ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয় গত বছরের আগস্ট মাসে রাজধানীর শেওড়াপাড়ায় সৈয়দা ফাহমিদা তাহসিনের (কেয়া) মৃত্যুর ঘটনা। স্বামী সিফাত আলী ফাহমিদা অসুস্থ জানিয়ে তাঁর মা–বাবাকে ফোন করে হাসপাতালে আসতে বলেন। হাসপাতালে চিকিৎসকেরা ফাহমিদাকে মৃত ঘোষণা করলে তিনি লাশ রেখে পালিয়ে যান। চার সন্তানের মা ফাহমিদা আত্মহত্যা করেছেন বলে দাবি করেন স্বামী। এ ঘটনায় ফাহমিদার মা হত্যা মামলা করেন সিফাতের বিরুদ্ধে। সিফাত দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন। সবশেষ এ ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে ফাহমিদার ফুফা মো. শামসুদ্দোহা খান প্রথম আলোকে বলেন, আগাম জামিন নিতে হাইকোর্টে গিয়েছিলেন সিফাত। জামিনের আবেদন নাকচ হলে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। দেড় মাস কারাগারে থাকার পর জামিনে মুক্তি পান। ফাহমিদার চার সন্তান এখন নানা-নানির কাছে আছে বলে তিনি জানান।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম প্রথম আলোকে বলেন, পারিবারিক সহিংসতাকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ার সংস্কৃতি রয়েছে। এই অপরাধকে গ্রহণযোগ্যতার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একটা মেয়ের জীবনে যেন বিয়েটাই সব! মেয়েটিকে নির্যাতন সহ্য করেও সংসার করতে বলা হয়। তিনি আরও বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ও পারিবারিক সহিংসতা (সুরক্ষা ও প্রতিরোধ) আইনের আওতায় ভুক্তভোগীরা বিচার চাইতে পারেন। তবে নারী নির্যাতনের অভিযোগে হওয়া মামলার বিরুদ্ধে একধরনের অপপ্রচার চালানো হয় যে ৯৯ শতাংশই ভুয়া। এ ধরনের অপপ্রচার বন্ধ করে ভুক্তভোগীদের বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে যাতে পরিবারগুলো বিচার চাইতে আগ্রহী হয়।
বিচার না হওয়ায় অভিযুক্তরা সাহসী হয়ে উঠছে
স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা কঠিন। কারণ, অনেকে অভিযোগই করেন না। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ সংকলিত করে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানিয়েছে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত আট মাসে পারিবারিক সহিংসতার ২৮৪টি খবর প্রকাশ হয়েছে। মামলা হয়েছে ১১৯টি ঘটনায়। বাকিগুলোর বিষয়ে তথ্য নেই। ভুক্তভোগী নারীদের মধ্যে ১০৮ জন স্বামীর হাতে হত্যা ও ২২ জন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ১২ মাসে পারিবারিক সহিংসতার ৫৬০টি ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছিল। মামলা হয়েছিল ২৪৮টি ঘটনায়। স্বামীর হাতে ২১৭টি হত্যা ও ২৮টি নির্যাতনের ঘটনা ছিল।
পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট ‘আমরাই পারি’র (উই ক্যান) প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক প্রথম আলোকে বলেন, পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা কখনোই কম নয়। এই নির্যাতন প্রতিরোধে যেভাবে কাজ করা উচিত, সেভাবে হচ্ছে না। শুধু আইন পরিবর্তন, সংস্কার—এসবের মাধ্যমে এ ধরনের নির্যাতন প্রতিরোধ হবে না। মাঠে গিয়ে মানুষকে বোঝাতে হবে যে নারীর প্রতি তাদের আচরণগত পরিবর্তন দরকার। বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা কাটাতে রাষ্ট্রকে ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ নীতি নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ, বিচারের হার কম হওয়ায় অপরাধীরা সাহসী হয়ে উঠছে।
-
Advertisement

মাইদার মৃত্যুর দুই দিন পার হয়েছে। যে মেয়ে মাকে প্রতিদিন কল দিতেন, তাঁর কল আর আসে না। শোকগ্রস্ত মা আহাজারি করতে করতে বলছিলেন, ‘মেয়েটার বয়স যখন তিন বছর, তখন ওর বাবা মারা গেছে। অনেক কষ্ট করে ওদের মানুষ করছি। আমার মেয়েটারে শ্বাসরোধ করে মারছে। আপনারা দেইখেন, ওর (সিয়াম) যেন ফাঁসি হয়।’



