ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম,বিনোদন প্রতিনিধি, রোববার,৩০ আগস্ট ২০২৬,১৪ ভাদ্র ১৪৩৩১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮:
একটি কণ্ঠ কখনো শুধু গান গায় না, কখনো হয়ে ওঠে একটি সময়ের স্মৃতি। আব্দুল জব্বারের কণ্ঠও তেমনই—সিনেমার পর্দা, প্রেম-বিরহ থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিন; নানা অনুভূতির সঙ্গে মিশে আছে তার অসংখ্য গান। ২০১৭ সালের ৩০ আগস্ট প্রয়াত এই কিংবদন্তি শিল্পীর কণ্ঠ আজও শ্রোতাদের কাছে সমানভাবে পরিচিত।
Advertisement

-
আপনি অপরাধমূলক সংবাদ পাঠাতে পারেন লিখা ও ভিডিও এবং চিত্রসহ প্রধান সম্পাদক মোঃ ইসমাইল হোসেন দ্বায়ী থাকবেন। আপনার নাম ও ঠিকানা এবং মোবাইল নাম্বার গোপন থাকবে। লিখুন আমার ফেইজ বুকে Md Ismail Hossain অথবা ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম।মোবাইল: ০১৭১৪৪৯৭৮৮৫,০১৮০৬৬৭৬৬৬৩
১৯৩৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ার আড়ুয়াপাড়ায় জন্ম আব্দুল জব্বারের। সেখানেই তার পড়াশোনা। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি আগ্রহ ছিল। গানের প্রাথমিক তালিম নেন ওস্তাদ ওসমান গণি ও ওস্তাদ লুৎফুল হকের কাছে।
মাত্র ২০ বছর বয়সে তৎকালীন পাকিস্তান বেতারে তালিকাভুক্ত হন তিনি। চার বছর পর, ২৪ বছর বয়সে শুরু হয় তার প্লেব্যাক যাত্রা। ১৯৬৪ সালে বিটিভিতে তালিকাভুক্ত হওয়ার পাশাপাশি দেশের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ‘সংগম’-এর গানে কণ্ঠ দেন তিনি।
৬০ ও ৭০ এর দশকে আব্দুল জব্বার প্লেব্যাক শিল্পী: একটি কণ্ঠ, অসংখ্য স্মৃতির গান
তবে, আব্দুল জব্বারের পরিচয় শুধু চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। তার কণ্ঠে কখনো ফুটে উঠেছে জীবনের হতাশা, কখনো প্রেম ও বিরহ, আবার কখনো জেগে উঠেছে দেশপ্রেমের তীব্র আবেগ।
১৯৬৮ সালের ‘এতটুকু আশা’ সিনেমায় সত্য সাহার সুরে তার গাওয়া ‘তুমি কি দেখেছো কভু জীবনের পরাজয়’ শ্রোতাদের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেয়। গানের কথায় জীবনের কঠিন বাস্তবতা আর কণ্ঠে আবেগ—দুটির মেলবন্ধন গানটিকে সময়ের সঙ্গে আরো গভীর করেছে।
রবিন ঘোষের সুরে ‘পীচ ঢালা পথ’ সিনেমার টাইটেল গানেও পাওয়া যায় তার স্বতন্ত্র কণ্ঠ। রাজ্জাক ও ববিতা অভিনীত সিনেমাটির ‘পীচ ঢালা এই পথটারে ভালোবেসেছি’ গানটি আজও বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় গানের তালিকায় স্মরণীয় হয়ে আছে।
১৯৭৮ সালে মুক্তি পাওয়া আবদুল্লাহ আল মামুনের ‘সারেং বৌ’ সিনেমায় আলম খানের সুরে আব্দুল জব্বারের কণ্ঠে আসে ‘ও রে নীল দরিয়া’। গানটি তাকে নতুন করে দেশজুড়ে জনপ্রিয়তা এনে দেয়। সময় পেরিয়ে গানটি একাধিক শিল্পীর কণ্ঠে নতুনভাবে এসেছে, তবে মূল গানের আবেদন এখনো অটুট।
তরুণ বয়সে আব্দুল জব্বার: মুক্তিযুদ্ধ থেকে চলচ্চিত্র—গানে গানে অমর আব্দুল জব্বার
তার সংগীতজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দিয়ে তিনি গেয়েছেন ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’, ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’সহ বহু গান। যুদ্ধের সেই সময়ে এসব গান মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস ও প্রেরণা জোগাত।
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতেও সক্রিয় ছিলেন আব্দুল জব্বার। প্রখ্যাত ভারতীয় কণ্ঠশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে মুম্বাইয়ের বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত তৈরিতে কাজ করেন তিনি। কলকাতায় অবস্থানরত বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পেও ঘুরেছেন; হারমোনিয়াম বাজিয়ে গণসংগীত পরিবেশন করে অনুপ্রাণিত করেছেন বীর যোদ্ধাদের। যুদ্ধের সময় বিভিন্ন স্থানে গণসংগীত গেয়ে পাওয়া প্রায় ১২ লাখ রুপি তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের ত্রাণ তহবিলে দান করেন। ফলে তার শিল্পীসত্তার সঙ্গে দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার বিষয়টিও গভীরভাবে জড়িয়ে যায়।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে আব্দুল জব্বার খুব বেছে বেছে গান করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য প্লেব্যাকের সিনেমার মধ্যে রয়েছে ‘সংগম’, ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’, ‘এতটুকু আশা’, ‘পীচ ঢালা পথ’, ‘দীপ নেভে নাই’, ‘বিনিময়’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘নাচের পুতুল’, ‘মানুষের মন’, ‘আলোর মিছিল’, ‘সূর্যগ্রহণ’, ‘অঙ্গার’, ‘সারেং বৌ’ ও ‘সখী তুমি কার’।
তার গানের ব্যাপ্তি যে কেবল বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তারও স্বীকৃতি মিলেছে। ২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসির করা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গানের তালিকায় জায়গা করে নেয় তার গাওয়া তিনটি গান—‘সালাম সালাম হাজার সালাম’, ‘জয় বাংলার জয়’ ও ‘তুমি কি দেখেছো কভু জীবনের পরাজয়’।
সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৮০ সালে একুশে পদক পান আব্দুল জব্বার। ১৯৯৬ সালে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। পরে ২০১১ সালে চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডসে পান আজীবন সম্মাননা।
Advertisement

শিল্পীর জীবন থেমে গেছে ২০১৭ সালের ৩০ আগস্ট। কিন্তু কিছু কণ্ঠ সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায় না। আব্দুল জব্বারের গানও তেমন—কখনো মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি হয়ে, কখনো পুরোনো সিনেমার আবেশ হয়ে, আবার কখনো নিঃসঙ্গ মুহূর্তের সঙ্গী হয়ে ফিরে আসে। তাই প্রয়াণের বছর পেরোলেও তার গান থেকে যায় শ্রোতাদের নিজস্ব স্মৃতির ভেতর।



