ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম,নাটোরের বড়াইগ্রাম প্রতিনিধি, বৃহস্পতিবার,২৭ আগস্ট ২০২৬,১১ ভাদ্র ১৪৩৩১৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮:
গলা থেকে পা পর্যন্ত মাটিতে পুঁতে রাখা। চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার। চলছে তন্ত্র-মন্ত্রের আসর। ভয়ানক শব্দ, অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি আর নানা কৌশলে তৈরি করা হয় ভৌতিক পরিবেশ। এরপর দাবি করা হয়— হাজির হয়েছে জিন, পরী কিংবা অদৃশ্য কোনো শক্তি। পৃথিবীর এমন কোনো সমস্যা নেই, যার সমাধান তারা করতে পারে না। তবে এর বিনিময়ে দিতে হবে হাজার হাজার টাকা থেকে শুরু করে ছাগল, গরু কিংবা মহিষ।
-
Advertisement

-
আপনি অপরাধমূলক সংবাদ পাঠাতে পারেন লিখা ও ভিডিও এবং চিত্রসহ প্রধান সম্পাদক মোঃ ইসমাইল হোসেন দ্বায়ী থাকবেন। আপনার নাম ও ঠিকানা এবং মোবাইল নাম্বার গোপন থাকবে। লিখুন আমার ফেইজ বুকে Md Ismail Hossain অথবা ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম।মোবাইল: ০১৭১৪৪৯৭৮৮৫,০১৮০৬৬৭৬৬৬৩
এমনই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার সীমান্তঘেঁষা চৌমহন গ্রাম ঘিরে। স্থানীয়দের দাবি, ছোট্ট এ গ্রামে গড়ে উঠেছে কথিত ‘জিনের বাদশা’ ও তান্ত্রিকদের একটি সিন্ডিকেট। ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের অলৌকিক ক্ষমতার প্রচার চালিয়ে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া ও ইউরোপে থাকা প্রবাসীদের টার্গেট করে ভয়ভীতি দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পারিবারিক অশান্তি, দাম্পত্য কলহ, সন্তান অবাধ্য হওয়া কিংবা ব্যক্তিগত নানা সমস্যার সমাধানের কথা বলে প্রথমে অল্প পরিমাণ টাকা নেওয়া হয়। পরে কথিত জিন-পরীর ভয় দেখিয়ে ধাপে ধাপে আরও টাকা, ছাগল, গরু কিংবা মহিষের মূল্য দাবি করা হয়। একপর্যায়ে আতঙ্কিত হয়ে ভুক্তভোগীরা দাবিকৃত অর্থ পাঠাতে বাধ্য হন।
বংশ নির্বংশ করে দেওয়ার ভয়
মালয়েশিয়া প্রবাসী মো. আলামিন হোসেন অভিযোগ করেন, সোহান নামের এক কথিত জিনের বাদশার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ওই ব্যক্তি তার পারিবারিক সমস্যা সমাধানের কথা বলে যোগাযোগ করেন। পরে নানা ভয়ভীতি দেখিয়ে তার কাছ থেকে দেড় লাখ টাকার বেশি নেওয়া হয়েছে।
আলামিনের ভাষ্য, তাকে বলা হয়—আর টাকা না দিলে তার বংশ নির্বংশ করে দেওয়া হবে। এমনকি পরী দিয়ে পরিবারের সদস্যদের উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার ভয়ও দেখানো হয়। এ সব কথায় তিনি ক্রমাগত আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন।
১০১টি ছাগল চাওয়া
লন্ডন প্রবাসী বদরুল ইসলাম জানান, প্রথমে রাতে হাজিরার জন্য ২১ টাকা বা ৩০০ টাকা চাওয়া হয়। এরপর কথিত জিনের চাহিদার কথা বলে ধাপে ধাপে টাকা নেওয়া শুরু হয়।
বদরুলের অভিযোগ, বিকাশের মাধ্যমে তার কাছ থেকে প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। পরে বলা হয়, ১০১টি ছাগল না দিলে পরী তাকে নিয়ে যাবে এবং তার মৃত্যু হতে পারে। পরিবারের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তিনি ও স্বজনরা আরও টাকা পাঠান।
১৫০০ ভোটারের গ্রামে ৩৭ জিনের বাদশা!
স্থানীয়রা জানান, চৌমহন গ্রামে ভোটার সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৫০০। এর মধ্যে অন্তত ৩৭ জন কথিত ‘জিনের বাদশা’ রয়েছেন। তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে ১০ থেকে ১৫ জন করে সহযোগী কাজ করেন। পাশের কুশমাইল ও সংগ্রামপুর গ্রামেও আরও ৮ থেকে ১০ জন কথিত জিনের বাদশা রয়েছেন বলে দাবি করে স্থানীয়রা।
তবে তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পান অনেকে। চৌমহন বাজার ও বটতলা মোড় এলাকায় কয়েকজন নারী, তরুণ ও বয়স্ক মানুষের সঙ্গে কথা বলতে গেলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকে জানান, এ সব ব্যক্তির বিরুদ্ধে কথা বললে বিপদে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দিনে তারা সাধারণ মানুষের মতো চলাফেরা করেন। কিন্তু রাত নামলে শুরু হয় কথিত জিন-ভূতের আসর, ভিডিও ধারণ ও অনলাইন প্রচারণা।
দিনমজুর থেকে রাতারাতি কোটিপতি
চৌমহন এলাকার বাসিন্দা মিঠুন সরদার বলেন, অভিনয় ও ভয় দেখিয়ে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস অর্জন করেছেন কথিত কবিরাজ ও জিনের বাদশারা। তাবিজ, কুফরি কাজ কিংবা জিন-ভূতের ভয় দেখিয়ে বিপদে পড়া মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হচ্ছে।
তার দাবি, আগে যাদের কেউ বিল-জমিতে কাজ করতেন, কেউ ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন, তাদের অনেকে এখন দামি মোটরসাইকেল, গাড়ি ও বাড়ির মালিক। অল্প সময়ের মধ্যে তাদের জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।
মিঠুনের অভিযোগ, মানুষের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেওয়ার পর সেই টাকার সামান্য অংশ মসজিদ-মাদ্রাসায় দান করে নিজেদের ভালো মানুষ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়।
এক প্রবাসীর কাছ থেকে দেড় কোটি টাকা
বড়াইগ্রামের বাসিন্দা মখলেসুর রহমান বলেন, জিনের ভয় দেখিয়ে প্রতারণার পাশাপাশি এলাকায় মাদকের বিস্তার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। তার দাবি, এক ইতালি প্রবাসীর কাছ থেকে প্রতারকচক্র এক থেকে দেড় কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
তিনি বলেন, টাকা নেওয়ার পর অনেক সময় ব্যবহৃত বিকাশ নম্বর বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে পরে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এ ধরনের প্রতারণা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
জঙ্গল-ঝোপে ভৌতিক পরিবেশ তৈরি করে ভিডিও
বড়াইগ্রাম উপজেলার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক অহিদুল হক বলেন, কথিত জিনের বাদশারা এলাকার জঙ্গল ও ঝোপঝাড়ে গিয়ে ভৌতিক পরিবেশ তৈরি করেন। কখনও কথিত কবিরাজ, কখনও ভুক্তভোগীর ভূমিকায় অভিনয় করে ভিডিও ধারণ করা হয়। পরে এসব ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, এ সব ভিডিও দেখে দূর-দূরান্তের মানুষ যোগাযোগ করলে তাদের পারিবারিক কিংবা ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়। এরপর জিন-ভূতের ভয় দেখিয়ে বিকাশের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা নেওয়া হয়।
অহিদুল হকের দাবি, যারা আগে দিনমজুরি করতেন, তাদের অনেকেই এখন কয়েক লাখ টাকা দামের মোটরসাইকেল, গাড়ি ও জমির মালিক। প্রবাসীদের সঙ্গে প্রতারণা করে এসব অর্থ উপার্জন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একজন দিনমজুর রাতারাতি অর্থবিত্তের মালিক হয়ে যাওয়ায় অন্যরাও এ পথে ঝুঁকছেন।
সাংবাদিককে হুমকির অভিযোগ
প্রতারণার শিকার প্রবাসী ও স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কথিত জিনের বাদশা ইমরান, রিপন, সম্রাট, রাশিদুল ও রোকনুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে সাংবাদিকদের আসার খবর পেয়ে তারা সরে যান।
এ সময় তাদের সহযোগীরা মোটরসাইকেলে সাংবাদিকদের গতিবিধি নজরদারি করেন এবং নানা কটূক্তি ও অসহযোগিতা করেন।
এক কথিত জিনের বাদশা মুঠোফোনে স্থানীয় এক সাংবাদিককে হুমকি দেন। ফোনে তিনি গুরুজির অভিশাপ দেওয়ার কথা বলে ভয় দেখানোর পাশাপাশি মাটির নিচে পুঁতে ফেলার হুমকি দেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়েও ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দেন।
পুলিশের নজরদারি বাড়ানোর দাবি
এ বিষয়ে নাটোর জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইফতে খায়ের আলম বলেন, জিনের বাদশা পরিচয়ে প্রতারণার ঘটনায় এরই মধ্যে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এরপরও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এলাকাটির ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, কেউ আশঙ্কা বোধ করলে কিংবা প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত পুলিশকে তথ্য দিতে হবে। পুলিশের গোয়েন্দা ও নিয়মিত তৎপরতা আরও বাড়ানো হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি। ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রতারকদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে বলেও জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।
রাতভর চলে জিন-ভূতের ভিডিও ধারণ
স্থানীয়দের অভিযোগ, চৌমহনে গভীর রাত পর্যন্ত কথিত জিন-ভূতের কর্মকাণ্ডের ভিডিও ধারণ ও অনলাইন প্রচারণা চলে। এমনকি গ্রামের প্রবেশপথসহ বিভিন্ন গাছে গোপনে ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। এতে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ও জীবনযাত্রায় আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
-
Advertisement

সচেতন মহলের মতে, মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, পারিবারিক দুর্বলতা ও বিপদের সুযোগ নিয়ে এ ধরনের প্রতারণা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি করছে না, সমাজে ভয় ও কুসংস্কারও ছড়িয়ে দিচ্ছে। প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের প্রতারণামূলক প্রচারণা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।



