ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম,আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি,বৃহস্পতিবার ১৬ এপ্রিল ২০২৬ || বৈশাখ ৩ ১৪৩৩ || ২৭ শাওয়াল ১৪৪৭ হিজরি :
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ সাময়িকভাবে স্থগিত হওয়ার পর জয়-পরাজয়ের প্রশ্নটি এখন মূলধারার গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং রাজনৈতিক মহলে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ইরানি রাজনীতিবিদ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা—উভয় পক্ষই নিজেদের বিজয়ী দাবি করছে। এমনকি সংযুক্ত আরব আমিরাত, যারা কেবল রক্ষণাত্মক অবস্থানে ছিল এবং কোনো হামলায় অংশ নেয়নি, তারাও বিজয় দাবি করেছে।
Advertisement
অপরাধমূলক সংবাদ পাঠান
——————————-
আপনি অপরাধমূলক সংবাদ পাঠাতে পারেন লিখা ও ভিডিও এবং চিত্রসহ প্রধান সম্পাদক মোঃ ইসমাইল হোসেন দ্বায়ী থাকবেন। আপনার নাম ও ঠিকানা এবং মোবাইল নাম্বার গোপন থাকবে। লিখুন আমার ফেইজ বুকে Md Ismail Hossain অথবা ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম।মোবাইল: ০১৭১৪৪৯৭৮৮৫
——————————————
তাহলে এই যুদ্ধে আসলে জিতছে কে? প্রশ্নটি যতটা সহজ মনে হয়, তার চেয়েও বেশ জটিল।
সমকালীন যুদ্ধগুলো কোনো পক্ষকে বিজয়ী বা পরাজিত হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে বিশ্লেষক ও ইতিহাসবিদদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। ঐতিহাসিক যুদ্ধগুলোতে যুদ্ধক্ষেত্রের স্পষ্ট জয়কে রাজনৈতিক বিজয়ে রূপান্তর করা যেত; কিন্তু সমকালীন যুদ্ধগুলোর ফলাফল প্রায়ই অস্পষ্ট থাকে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা ‘মানবাধিকার’ এবং ‘আন্তর্জাতিক আইনের’ মতো উদার গণতান্ত্রিক ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠায় জয় ও পরাজয়ের মানদণ্ড বদলে গেছে। এই জটিলতা থেকেই ‘মানুষের হৃদয় জয় করার’ ধারণার উদ্ভব ঘটে, যা প্রথম দেখা যায় ভিয়েতনাম যুদ্ধে এবং পরে আরও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে নাইন-ইলেভেন (৯/১১) পরবর্তী ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধে।
জয় ও পরাজয়ের ধারণা এখন ‘প্রোপাগান্ডা’, নিজস্ব ব্যাখ্যা এবং ‘অপ্রতিসম যুদ্ধের’ (অসম প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে যুদ্ধ) ওপর নির্ভরশীল। ফলাফলের এই অস্পষ্টতা প্রতিটি পক্ষকেই বিজয়ের দাবি করার সুযোগ করে দেয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যুদ্ধে জয়ী হওয়ার দাবি ভোটারদের কাছে ক্ষমতাসীন দলকে আরও জনপ্রিয় করতে সাহায্য করে আর একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনসমর্থন ও বৈধতা ধরে রাখতে সহায়তা করে।
সমকালীন যুদ্ধে ‘জয়’ শব্দটির পরিভাষাগত অস্পষ্টতা বা নিজস্ব ব্যাখ্যার সুযোগ নিয়ে উভয় পক্ষই নিজেদের বিজয়ী দাবি করছে। মার্কিন ও ইসরায়েলি নাগরিকেরা ইরানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং পারমাণবিক স্থাপনার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি সামনে আনছেন। অন্যদিকে ইরান বলছে, তাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং ‘কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল’ সক্ষমতা অক্ষুণ্ন রয়েছে; পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির ওপর তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করেছে।
এ ছাড়া ‘অপ্রতিসম যুদ্ধের’ ধারণা কোনো দুর্বল পক্ষকে বিজয়ের দাবি করার সুযোগ দেয়, সেই পক্ষ কোনো দেশ হোক বা কোনো সংগঠন; যদি তারা পুরোপুরি ভেঙে পড়া এড়াতে পারে এবং তাদের প্রতিরোধের আদর্শকে টিকিয়ে রাখতে পারে। সাধারণত একটি শক্তিশালী পক্ষের তুলনায় দুর্বল পক্ষটি যুদ্ধে বেশি ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকে; কারণ, তারা এই লড়াইকে তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে দেখে।
জয় থেকে পরাজয়
সমকালীন যুদ্ধগুলোতে সামরিক বিজয় সব সময় রাজনৈতিক বিজয়ে রূপান্তর হয় না। ভিয়েতনাম যুদ্ধ এর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সেই যুদ্ধে ‘টেট অফেনসিভ’-এ যুক্তরাষ্ট্র ও তার দক্ষিণ ভিয়েতনামি মিত্রদের সামরিক বিজয় শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পরাজয়ে পর্যবসিত হয়েছিল; যা ভিয়েতকংদের নতুন সদস্য সংগ্রহে সহায়তা করেছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনকে উসকে দিয়েছিল।
যুদ্ধ যখন চলমান থাকে, তখন এর সামরিক বা রাজনৈতিক বিজয় নিরূপণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। ২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন এবং সাদ্দাম হোসেনের পতনকে তাৎক্ষণিকভাবে সামরিক ও রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু দ্রুতই তা পরাজয়ে রূপ নেয় এবং সাদ্দাম-পরবর্তী ইরাকে ইরানকে সর্বোচ্চ প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দেয়।
২০০১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান শাসনের পতনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের যে ‘বিজয়’ দৃশ্যমান হয়েছিল, তা মাত্র দুই দশকের ব্যবধানে চূড়ান্ত পরাজয়ে রূপ নেওয়ার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
ইরান যুদ্ধ একটি অপ্রতিসম ও চলমান সংঘাত হওয়ায় এখানে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করা বিশেষভাবে কঠিন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশলগত কিছু সাফল্য রয়েছে। তারা ইরানের কয়েক ডজন সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাকে হত্যা করেছে এবং দেশটির অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে।
তা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির আগপর্যন্ত ইরান ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি থাকা উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখেছিল।
সমকালীন যুদ্ধে ‘জয়’ শব্দটির পরিভাষাগত অস্পষ্টতা বা নিজস্ব ব্যাখ্যার সুযোগ নিয়ে উভয় পক্ষই নিজেদের বিজয়ী দাবি করছে। মার্কিন ও ইসরায়েলের নাগরিকেরা ইরানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং পারমাণবিক স্থাপনার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি সামনে আনছে। অন্যদিকে ইরান বলছে, তাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং ‘কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল’ সক্ষমতা অক্ষুণ্ন রয়েছে; পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির ওপর তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করেছে।
প্রকৃতপক্ষে উভয় পক্ষেরই নিজ নিজ জনগণের কাছে বিজয় ‘বিক্রি’ করার মতো ভিত্তি ও কারণ রয়েছে। কারণ, উভয় পক্ষই বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বেশ কিছু কৌশলগত জয় অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতা
রাজনৈতিক বিজয় কার হয়েছে—সেই মাপকাঠিতে বিচার করলে ফলাফল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষে যায় না। এই যুদ্ধের রাজনৈতিক লক্ষ্যগুলো ছিল ইরানে ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন’ (রেজিম চেঞ্জ) ঘটানো, একটি গণ-অভ্যুত্থান উসকে দেওয়া, সশস্ত্র কুর্দি বাহিনীকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সক্রিয় করা এবং ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া, যার প্রতিটিই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে।
সামরিক সক্ষমতার বিশাল ব্যবধানের কারণে কিছু কৌশলগত জয় পাওয়া গেলেও যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যগুলো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই যুদ্ধ শুরু করেছিল, তার একটিও অর্জিত হয়নি। উল্টো ইরান সফলভাবে এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুকে হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌ চলাচলের নিরাপত্তার দিকে সরিয়ে নিতে পেরেছে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করে ইরান আলোচনার টেবিলে নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে গেছে। পাকিস্তানে হওয়া আলোচনায় ইরান ১০ দফার একটি পরিকল্পনা নিয়ে হাজির হয়; যেখানে প্রণালির ওপর তাদের প্রভাবের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি, পারমাণবিক কর্মসূচি অব্যাহত রাখা এবং লেবাননে যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণের প্রস্তাব ছিল।
ট্রাম্প প্রশাসন শুরুতে এই পরিকল্পনার প্রতি ইতিবাচক সাড়া দিলেও পরে তা থেকে সরে আসে, যার ফলে ইসলামাবাদে আলোচনা ভেস্তে যায়।
ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। এমনকি তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও এই যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী হিসেবে গণ্য করে এতে অংশ নিতে অস্বীকার করেছে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বেআইনি যুদ্ধ শুরু করা; বালিকা বিদ্যালয়সহ বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে অসংখ্য শিশু হত্যা; একটি সার্বভৌম দেশের বৈধ নেতাকে হত্যা এবং একটি গোটা সভ্যতাকে ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার মাধ্যমে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী উদার গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ‘মানুষের হৃদয় জয়ের লড়াইয়ে’ হেরে যেতে পারে।
অন্যদিকে ইরানও রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল শোধনাগার ও বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর ফলে আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের সঙ্গে তাদের উত্তেজনা বেড়েছে। এই দেশগুলো এসব ঘটনাকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে। এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বলয়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও জোরদার করতে পারে, যা ভবিষ্যতে ইরানের জন্য সম্পর্ক মেরামতের পথ কঠিন করে তুলবে।
Advertisement

সামগ্রিকভাবে এই যুদ্ধের জয়ী বা পরাজিত কারা তা নিশ্চিত করে বলার সময় এখনো আসেনি। তবে সমকালীন যুদ্ধের বৈশিষ্ট্যগুলো বিবেচনা করলে এটি বলা সমীচীন হবে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একটি কৌশলগত সামরিক বিজয় অর্জন করলেও বৃহত্তর রাজনৈতিক লড়াইয়ে তারা হেরে যাচ্ছে।
আরাবি ২১ নিউজ ওয়েবসাইটের এডিটর-ইন-চিফ ফিরাস আবু হেলালের মতামত কলামটি মিডল ইস্ট আই-এ প্রকাশিত হয়েছে।



