ওয়ার্ল্ড ক্রাইম নিউজ ২৪.কম,আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি,শনিবার ২৯ নভেম্বর ২০২৫ || অগ্রহায়ণ ১৪ ১৪৩২ :
আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিওনে এখনো প্রবলভাবে টিকে আছে কালো জাদুর মতো কুসংস্কার। এই বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে একাধিক পরিবারে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে—যার নেপথ্যে রয়েছে মানবদেহের অঙ্গের অবৈধ বাণিজ্য। বিবিসি আফ্রিকা আইয়ের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভয়াবহ সব তথ্য।
Advertisement
চার বছর আগে পাপায়ো নামে ১১ বছরের এক কিশোরকে হত্যা করা হয় কালো জাদুর নামে। তাঁর মা সাল্লাই কালোকা এখনো অপেক্ষা করছেন ন্যায়বিচারের জন্য। বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘আমি কষ্টে আছি। তারা আমার সন্তানকে হত্যা করেছে, আর এখন শুধু নীরবতা।’
সাল্লাই জানান, মাছ বিক্রি করতে বাজারে যাওয়ার পর পাপায়ো আর বাড়ি ফেরেনি। পরে তাঁর দেহ পাওয়া গেলে দেখা যায়—শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, চোখ এবং এক হাত কেটে নেওয়া হয়েছে। দুই সপ্তাহ নিখোঁজ থাকার পর তাঁর ছিন্নবিচ্ছিন্ন দেহ উদ্ধার করা হয় এক পরিত্যক্ত কুয়া থেকে।
তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের সন্তানদের সব সময় সতর্ক থাকতে বলি। কোনো কোনায় যেয়ো না, অচেনা কারও দেওয়া কিছু নেবার আগে সাবধান হও। এখানে এ ঘটনা প্রায়ই ঘটে।’
সাল্লাইয়ের দাবি, তাঁর শহর মাকেনিতে এমন হত্যাকাণ্ড নিয়মিত। পুলিশ অনেক সময় এসবকে ‘রিচুয়াল কিলিং’ বলেও ঘোষণা করে না। জুজু অনুশীলনকারীরা মানব অঙ্গকে তাবিজ বা আচার–অনুষ্ঠানে ব্যবহার করে এবং ধনসম্পদ বা ক্ষমতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গ্রাহকদের প্রলুব্ধ করে। দেশে ৮৯ লাখ মানুষের জন্য মাত্র একজন প্যাথলজিস্ট থাকায় তদন্ত প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
Advertisement
প্রতিটি উপজেলায় সংবাদদাতা আবশ্যক। যোগাযোগ ০১৭১৪৪৯৭৮৮৫

সিয়েরা লিওনে কালো জাদুর প্রতি বিশ্বাস এতটাই গভীর যে পুলিশ সদস্যরাও অনেক সময় এসব মামলার অনুসন্ধানে ভয় পান। ফলে বেশির ভাগ অপরাধই অনুসন্ধানহীন থেকে যায়। বিবিসি আফ্রিকা আইয়ের অনুসন্ধান দল এমন দুই ব্যক্তিকে খুঁজে পেয়েছে—যারা নিজেদের জুজু অনুশীলনকারী দাবি করে এবং মানবদেহের অংশ সরবরাহের প্রস্তাব দেয়।
তাদের একজন জানান, পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে তাঁদের গ্রাহক রয়েছে। একজন সদস্য ‘ওসমান’ নামে এক রাজনীতিবিদের ছদ্মবেশে গিনি সীমান্তের কাম্বিয়া জেলায় গিয়ে দেখা করেন কানু নামের এক জুজু অনুশীলনকারীর সঙ্গে। পুরো সময় তাঁর মুখ ঢাকা ছিল লাল একটি গামছায়।
কানু বলেন, ‘গিনি, সেনেগাল আর নাইজেরিয়ার বড় বড় রাজনীতিবিদদের সঙ্গে কাজ করেছি। নির্বাচনের সময় এখানে লোকজন ভিড় করে।’ পরে তিনি শুকানো একটি মানব মস্তকের খুলি দেখিয়ে দাবি করেন, ‘এটি একজন মহিলার। দু–একদিনের মধ্যেই কেউ এটি নেবে।’ তাঁর ভাষ্য—নারীর অঙ্গপ্রত্যঙ্গের দাম ৭ কোটি লিওঁ বা ৩ হাজার ডলার।
বিবিসি পরে নিরাপত্তাজনিত কারণে তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করেনি। সংগৃহীত তথ্য পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
দেশটিতে অনেক জুজু অনুশীলনকারী নিজেদের হার্বালিস্ট পরিচয় দেয়। অথচ ২০২২ সালে দেশে নিবন্ধিত ডাক্তার ছিলেন মাত্র ১ হাজার, যেখানে প্রচলিত ভেষজ চিকিৎসক ছিলেন প্রায় ৪৫ হাজার। এখানকার সাধারণ মানুষ মানসিক স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন সমস্যায় এসব চিকিৎসকদের কাছে যান।
সিয়েরা লিওনের কাউন্সিল অব ট্র্যাডিশনাল হিলারসের সভাপতি শেকু তারাওয়ালি বলেন, কানুর মতো কালো শক্তির অনুশীলনকারীরা ভেষজ চিকিৎসকদের সুনাম নষ্ট করছে। তাঁর অভিযোগ, ক্ষমতা ও টাকার লোভে কিছু মানুষ এসব হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করে।
বিবিসি আফ্রিকা আই আরও খুঁজে পেয়েছে ওয়াটারলু এলাকার আরেক সন্দেহভাজন দেহাংশ সরবরাহকারীকে। ছদ্মনাম ‘ইদারা’ ব্যবহারকারী ওই ব্যক্তির দাবি, তাঁর অধীনে ২৫০ জন ওঝা–গুনিন কাজ করে এবং প্রয়োজন হলে যেকোনো অঙ্গ সরবরাহ করতে পারে।
একবার সাক্ষাতে তিনি তাঁর সহযোগীর পাঠানো একটি ভয়েস নোট শোনান—যেখানে বলা হচ্ছিল, তারা রাতে ‘শিকার’ খুঁজতে প্রস্তুত। এই তথ্য জানানো হলে পুলিশ কমিশনার ইব্রাহিম সামা অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর সঙ্গে কাজ করেন শেকু তারাওয়ালি ও বিশেষজ্ঞ দল। অভিযানে মানুষের হাড়, চুলসহ আরও বিভিন্ন দেহাংশ উদ্ধার হয়।
এর আগেও ওয়াটারলু এলাকায় একটি মন্দির থেকে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের লাশ উদ্ধার হয়েছিল। মামলাটি হাই কোর্টে গেলেও পরে আর অগ্রগতি হয়নি। আটক ব্যক্তিরাও জামিনে মুক্তি পান।
বিবিসি প্রতিবেদন তৈরির সময়ই মাকেনিতে খুন হন ফাতমাটা কন্তে নামে ২৮ বছরের এক নারী। জন্মদিনের পরদিন তাঁর লাশ রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে দেখা যায়। সামনের কয়েকটি দাঁত উপড়ে নেওয়ায় স্থানীয়রা ধরে নেয়—এটি কালো জাদু সংক্রান্ত হত্যা। পরিবার নিজ খরচে লাশ ফ্রিটাউনে পাঠিয়ে ময়নাতদন্ত করালেও কিছুই বের হয়নি।
Advertisement

পাপায়োর মায়ের মতো বহু পরিবার এখনো বিচারহীনতার যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছে। পুলিশের উদাসীনতা আর ভয়–ভীতির সংস্কৃতি পুরো অঞ্চলে আতঙ্ক বাড়িয়ে দিচ্ছে।



